রাব্বি আল-আমিন
, যশোর
হৃদরোগে আক্রান্ত একজন রোগীর কাছে প্রতিটি সেকেন্ডই জীবন-মৃত্যুর লড়াই। দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বাণিজ্যিক জেলা যশোরে সেই লড়াইয়ে গত দুই দশক ধরে হার মানছে অসংখ্য মানুষ।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ও আইসিইউ ভবন দৃশ্যমান হলেও লিফট জটিলতা, জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের কারণে এখনো মিলছে না পূর্ণাঙ্গ সেবা। ফলে, সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিসিইউ পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর নির্দেশনা দেওয়ায় এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী নতুন আইসিইউ ইউনিটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করায় যশোরবাসীর মনে আশার আলো জাগে। বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কিছু জটিলতার কারণে করোনারি কেয়ার ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। খুব শিগগিরই এটি চালু হবে।
বঞ্চনার ইতিহাস
২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে যশোরে একটি পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সিসিইউ ভবন উদ্বোধন করেন সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত তরিকুল ইসলাম। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে এর চিকিৎসা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২৪ জন চিকিৎসক ৫৬ জন নার্স ও ১৪৩ জন কর্মচারী নিয়োগের চাহিদাপত্র পাঠায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে।
২০০৮ সালের মার্চে বিশেষ ব্যবস্থায় হাসপাতালের নিজস্ব জনবল ও কিছু মেশিন স্থাপনের মাধ্যমে চালু হয় সেবা কার্যক্রম। উদ্বোধনও হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু ২০০৯ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কার্যকর লিফটের সংকটে দীর্ঘ দুই দশক ধরে অচল পড়ে আছে জীবন বাঁচানোর এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। দীর্ঘদিন চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ।
কাগজে-কলমেই উদ্বোধন!
২০২০ সালে করোনা মহামারীর পর ২০২১ সালের নভেম্বরে হাসপাতালের দ্বিতীয়তলায় বেসরকারি সংস্থা ‘সাজেদা ফাউন্ডেশনের’ সহায়তায় দশ শয্যার একটি আইসিইউ চালু হয়। পরবর্তীতে তারা এটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করলে কোনো রকমে নিজস্ব জনবল দিয়ে তা চালু রাখা হয়।
২০২৩ সালে সিসিইউ ভবনের চতুর্থ তলায় নতুন করে দশ শয্যার আইসিইউ এবং দশ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট প্রস্তুত করা হয়। হাসপাতালটিতে সিসিইউর মোট শয্যা ২৮টি হলেও প্রতি মাসে অন্তত ১০০ শয্যার চাহিদা থাকে। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন শতাধিক হৃদরোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের পর, যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের দাবির প্রেক্ষিতে গত ৭ মে সচিবালয়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সিসিইউ দ্রুত পূর্ণাঙ্গ চালুর নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগে যশোরবাসী ও চিকিৎসকদের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা দেখা দিয়েছে।
বিগত ১৪ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশের দশটি জেলা হাসপাতালের সাথে যশোরের এই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটিও (আইসিইউ) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের পর পেরিয়ে গেছে বেশ কিছু দিন, চতুর্থতলায় রোগী ওঠানামার জন্য লিফট না থাকা এবং প্রয়োজনীয় ৭০ জন চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও সরঞ্জামের অভাবে এই আধুনিক ইউনিটটি এখনো রোগীদের কল্যাণে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
উদ্বিগ্ন যশোরবাসী
পূর্ণাঙ্গ সেবা না থাকায় হৃদরোগে আক্রান্তদের নিয়ে স্বজনদের ছুটতে হচ্ছে ঢাকা কিংবা খুলনায়। কেউ যাচ্ছেন সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে, কেউবা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই দীর্ঘ পথ হয়ে উঠছে শেষযাত্রা। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে পথেই ঝরে যায় বহু মূল্যবান প্রাণ। পরিবারের বুকভাঙা কান্না আর স্বজন হারানোর বেদনা যেনো প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয়, একটি সচল আইসিউ ও সিসিইউ কতোটা জরুরি।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি যশোরবাসী প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিসিইউ চালু হলে যশোরসহ আশপাশের জেলার হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে রাজধানীমুখী চাপ কিছুটা কমবে।
যশোরসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার লাখ লাখ মানুষের উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসার স্বার্থে এই আমলাতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা দ্রুত দূর করে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার দাবি এখন সর্বস্তরের মানুষের।
শহরের স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ মাহমুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রাচীনতম ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে চিকিৎসার মান এখানে উন্নত হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে করোনারি কেয়ার ইউনিট এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়া অষ্টম আশ্চর্যের ব্যাপার।
শহরের স্থানীয় বাসিন্দা শামসুল আলম জানান, সাবেক প্রয়াত মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের হাতে করোনারি কেয়ার ইউনিটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যশোরবাসীর এটা গর্বের বিষয় ছিল। পরবর্তীতে এটা ওইভাবে আর কেউ গুরুত্ব না দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ভাবে চালু করেনি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিসিইউসহ এই ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গ হবে চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে খুলনা বা ঢাকায় যাওয়া লাগবে না।
চিকিৎসায় ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা
যশোর জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. রবিউল ইসলাম তুহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে যশোরবাসীর জন্য সুখবর বয়ে আনবে। হার্ট অ্যাটাক হলে যে এনজিওগ্রাম করা হয়, এটা এখান থেকে করা সম্ভব হবে। এনজিওগ্রাম কেতে ঢাকা বা খুলনায় যেতে যে সময় ব্যয় হয়, তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এর ফলে এই রোগের যে প্রকৃত সমস্যা তার চিকিৎসা সঙ্গে সঙ্গে আমরা দিতে পারবো। রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা পাবে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় দশ বেডের আইসিইউ সচল রেখেছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা উদ্বোধন করেছেন, সেটিও আমরা দেখভাল করছি। আরও দশ বেডের সিসিইউ এবং দশ বেডের আইসোলেশন দ্রুতই চালু হবে। চতুর্থ তলায় লিফট জটিলতার কারণে আমরা পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারিনি। এখন বরাদ্দ চলে এসেছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের চাহিদাপত্রও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি অতি দ্রুতই এই জটিলতা কেটে যাবে।