যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

গাছগুলো যায় কোথায়

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ২৮ জুন,২০২৬, ১০:০০ এ এম
গাছগুলো যায় কোথায়

প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যশোরসহ সারা দেশে লাখ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হয়। পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা বলে এসব কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয় বিপুল অর্থ। কিন্তু রোপণ করা চারার কতগুলো শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে, কতগুলো মারা যায় এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদ, সচেতন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।

এই বর্ষা মওসুমে বৃক্ষরোপণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি চলছে। কিন্তু যশোরে বৃক্ষরোপণের বাস্তব চিত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর লাখ লাখ চারা রোপণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হলেও গাছ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দিবস বা মওসুমকেন্দ্রিক কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর চারাগুলোর আর কোনো খোঁজ থাকে না।

সরেজমিনে যশোর শহরের ভৈরব নদীর তীর, সদরের পুরাতন খয়েরতলা বাজারসংলগ্ন ট্রাস্ট পাম্প এলাকা, ঝুমঝুমপুর বিসিক শিল্পনগরীর সামনের সামাজিক বনায়ন এলাকা এবং আরও কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যেখানে সামাজিক বন বিভাগের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছিল, সেখানে এখন আর নেই সবুজের অস্তিত্ব। অধিকাংশ স্থানে রোপণ করা গাছের পরিবর্তে জন্মেছে আগাছা, লতাপাতা ও ঝোপঝাড়। কোথাও কোথাও রোপণ করা গাছের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ তদারকি, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময়কার সামাজিক বনায়নের গাছগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা এসব সবুজায়ন প্রকল্পের অধিকাংশই এখন কার্যত অস্তিত্বহীন।

যশোর সামাজিক বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলমান কর্মসূচির আওতায় জেলায় এবছর ৬৫ হাজার বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও বজ্রপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় তালগাছ রোপণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিভাগটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানে ১৫৩ কিলোমিটারজুড়ে তালগাছের সারি গড়ে তোলা হবে। প্রতি কিলোমিটারে এক হাজারটি করে তালগাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে এই প্রকল্পের আওতায় মোট এক লাখ ৫৩ হাজার তালগাছ রোপণ করা হবে। চলমান ৬৫ হাজার সাধারণ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে এ সংখ্যা যোগ করলে জেলায় প্রায় দুই লাখ ১৮ হাজার গাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিবেশবিদদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক চারা রোপণের পাশাপাশি সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা, সুরক্ষা ও টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত না করা গেলে এ উদ্যোগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, সম্প্রতি যশোর জেলা প্রশাসন ও সামাজিক বন বিভাগের যৌথ আয়োজনে শহরের নবকিশলয় স্কুল প্রাঙ্গণে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ের এ কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়।

এর পাশাপাশি যশোর পৌরসভার উদ্যোগে ছয় মাসব্যাপী ‘এক হাজার বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি চালু হয়েছে।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও কৃষকদের জমিতে তিন হাজার ৯৭০টি ফলদ ও ওষধি গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি ছাত্র সংগঠন, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও মাঠপর্যায়ে চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

যশোর জেলা নাগরিক অধিকার আন্দোলন কমিটির সমন্বয়কারী শেখ মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, শুধু গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। গাছগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে গাছগুলোর তদারকির ব্যবস্থা করলে সেগুলো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। আগে একশ’টি গাছ লাগালে ৯০টি বেঁচে যেত, এখন ৪০টিও টিকে থাকে না।

তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় পরিকল্পিত বনাঞ্চল তৈরি করতে হবে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। বনজ ও ওষধি গাছের পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তালগাছ বজ্রপাত সহনশীল এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষক হাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিবছর বৃক্ষরোপণের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সেই অর্থের বিপরীতে কতগুলো গাছ টিকে আছে, তার কোনো জবাবদিহিতা নেই। শুধু চারা লাগানোর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মূল্যায়ন করলে চলবে না। একটি গাছ লাগানোর চেয়ে সেটিকে পাঁচ বছর বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গাছ বাঁচানোর জন্য স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

পরিবেশকর্মী অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ বলেন, প্রতিবছর একই জায়গায় নতুন করে চারা লাগানো হয়, কারণ আগের বছরের চারাগুলো বাঁচে না। এটা শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়, সরকারি অর্থেরও অপচয়। বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে ব্যয় হওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে চারার টিকে থাকার হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

যশোর শহরের বাসিন্দা শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, একদিকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নের নামে পুরনো বড় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। একটি ৩০ বছরের পুরনো গাছ কেটে দশটি চারা লাগালেও সেই ক্ষতি সহজে পূরণ হয় না। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, যশোরের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক বনায়ন, সড়কের পাশের সবুজায়ন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রতিবছর হাজার হাজার চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু রোপণের পর সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুরক্ষা বেষ্টনী নির্মাণ এবং নিয়মিত তদারকির অভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চারা মারা যায়। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কাক্সিক্ষত পরিবেশগত সুফল পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে পাঁচটি জেলার দায়িত্বে থাকা বন কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল বলেন, ‘শুধু যশোরেই ৬৫ হাজার বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি চলমান রয়েছে। বর্তমানে আমরা তালগাছ রোপণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ১৫৩ সিডলিং কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে এক হাজারটি করে তালগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

তবে রোপণ করা গাছের বেঁচে থাকার হার, আগের বছরগুলোর চারার টিকে থাকার পরিসংখ্যান কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি। তিনি শুধু বলেন, ‘আমাদের গাছ পরিচর্যার জন্য লোক আছে। তারা নিয়মিত পরিচর্যা করেন।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)