আব্দুস সামাদ
, সাতক্ষীরা
চলতি অর্থবছরে সাতক্ষীরার গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
জেলায় চরম বালু সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিটুমিনের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির মধ্যেও গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে অন্তত ২৬ ভাগ বেশি কাজ সম্পন্ন করেছে দপ্তরটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দপ্তরটির কাজের সামগ্রিক গড় অগ্রগতির হার ছিল ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যা চলতি অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৮৯.৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাতক্ষীরা জেলায় গ্রামীণ সড়ক কার্পেটিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩৭ কিলোমিটার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৪৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলমান রয়েছে ৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার কাজ; যা আগামী শীত মৌসুমের মধ্যেই শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলমান কাজের অগ্রগতিসহ লক্ষ্যমাত্রার ৭৮ ভাগ কাজ সম্পন্ন করেছে দপ্তরটি। একই সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ছিল ৫২ শতাংশ।
এলজিইডি সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ছয়টি বক্স কালভার্ট, ২৫০ মিটার ব্রিজ সংস্কার, ১৫টি হাট-বাজারের উন্নয়ন, দুটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, তিনটি স্কুলের প্রাচীর নির্মাণ, ১৩টি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষ নির্মাণ, আটটি স্কুল সংস্কার, তিনটি স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ এবং দুই হাজার ৩১১টি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। যার শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া দশটি ব্রিজ নির্মাণের লক্ষ্য ছিল, সম্পন্ন হয়েছে চারটি। চলমান ছয়টির কাজসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৭৬ শতাংশ। ১৬টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ কাজের মধ্যে একটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলমান ১৫টির কাজসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৬৩ শতাংশ। ৩২টি মসজিদ ও মন্দির উন্নয়নের কাজের মধ্যে ২৮টির কাজ শেষ হয়েছে। চলমান চারটির কাজসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৮৮ শতাংশ। ৪০৫ মিটার ড্রেনের মধ্যে ২৯৭ মিটার ড্রেন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। চলমান কাজসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৭৩ শতাংশ। পাঁচ দশমিক চার কিলোমিটার খালের মধ্যে চার দশমিক ২৪ কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে। চলমান কাজসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৭৮ শতাংশ। ২৭টি পুকুরের মধ্যে ২০টির খননের কাজ শেষ হয়েছে। চলমান সাতটির কাজসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৭৪ শতাংশ।
সূত্র জানায়, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গোয়ালডাঙ্গা জিসি টু প্রতাপনগর জিসির ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার, খাজরা ইউপি টু বড়দল সড়কের প্রায় সাত কিলোমিটার, তালার দলুয়া জিসি টু বুধহাটা জিসির ৪.১ কিলোমিটার, দেবহাটার সুর্বনবাদ জিসি টু কোমরপুর জিসির ছয় কিলোমিটার, দেবহাটা ইউপি অফিস টু ভাতশালা কোমরপুর সড়কের দুই কিলোমিটার, নাংলা বাজার টু পানির কল পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার, বদরতলা টু গাজীরহাট ১.৮ কিলোমিটার, কালিগঞ্জের বাঁশতলা বাজার টু কাশিমাড়ি সড়কের দুই কিলোমিটার, কালিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড টু তারালী সড়কের দেড় কিলোমিটার, কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ টু মথুরেশপুর ইউপি সড়কের ১.৩ কিলোমিটার, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কদমতলা টু কাথন্ডা জিসির ২.৫ কিলোমিটার, কলারোয়ার তুলসীডাঙ্গা টু কুশোডাঙ্গা ইউপি অফিসের ৩.৭ কিলোমিটার, শ্যামনগরের গ্যারেজ বাজার থেকে হরিনগর বাজার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার, বুড়িগোয়ালিনী ইউপি টু নীলডুমুর ঘাট সড়কের ৩.৩ কিলোমিটারসহ প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার গ্রামীণ শতাধিক সড়কের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন লাখ লাখ মানুষ।
আগে যেখানে সড়ক উন্নয়নের নামে রাস্তা খুড়ে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হতো, সেখানে চলতি অর্থবছরে এলজিইডির কর্মতৎপরতায় কাজ সম্পন্নের হার ৮৯.৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই এসব গ্রামীণ সড়কের কাজ শেষ হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
শ্যামনগরের কচুখালী গ্রামের গৌর মন্ডল বলেন, ‘আমার বয়স ৭০ বছর হয়েছে। এর আগে শ্যামনগরের গ্যারেজ বাজার থেকে হরিনগর বাজার রাস্তায় তিন বার কাজ হতে দেখেছি। কিন্তু এবারই প্রথম আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কাজ হতে দেখলাম। আমার বাড়ি রাস্তার পাশেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি রাস্তার কাজ দেখেছি। এতো দ্রুত কাজটি শেষ হবে আমরা ভাবতেও পারিনি। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমায় আমরা খুশি। রাস্তাটি মেরামত হওয়ার ফলে এ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হয়েছে।’
হরিনগর বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে এই রাস্তা দিয়ে মালামাল আনতে খুবই অসুবিধা হতো। তাছাড়া শ্যামনগর থেকে মুন্সিগঞ্জ হয়ে হরিনগর বাজারে আসতে কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরতে হতো, তাতে পরিবহন খরচও অনেক বেড়ে যেত। কিন্তু রাস্তাটি দ্রুত মেরামত করার ফলে তারা সহজে মালামাল পরিবহন করতে পারছেন। এতে খরচও অনেক কমেছে।
এদিকে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি অর্জন করতে না পারায় কেবিএস (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) প্রকল্পের অনেক কাজে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে দপ্তরটি।
কাজ বাস্তবায়নকারী কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, জেলায় চরম বালু সংকট, বৈশ্বিক জ¦ালানি সংকট ও বিটুমিনের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে কাজ বাস্তবায়ন করতে হিমসিম খেতে হয়েছে। তারপরও কাজের গুণগত মান রক্ষা করে শতাধিক গ্রামীণ সড়কের কাজ শেষ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এলজিইডি সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম তারিকুল হাসান খান বলেন, চলতি অর্থবছরে কাজ করা অনেক চ্যালেঞ্জের ছিল। জেলায় বালু ও জ্বালানি সংকট এবং বিটুমিনের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পরও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
দাপ্তরিক নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এলজিইডির উপজেলা অফিসগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলীদের কোনো যানবাহন না থাকায় নিয়মিত তদারকির বিষয়টিও বিঘ্নিত হয়। কারণ অর্থের অংকে কম হলেও উপজেলাগুলোতে স্কিম সংখ্যা অনেক বেশি। তাই এলজিইডির কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির জন্য দপ্তরগুলোতে জনবল বৃদ্ধি এবং উপজেলা প্রকৌশলীদের যানবাহন সরবরাহ করা উচিত।
মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সাতক্ষীরায় এসেছি মাত্র ১১ মাস। যোগদানের পর প্রতিটি কাজই সর্বোচ্চ তদারকির মাধ্যমে শেষ করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ বুঝে না বুঝে অপপ্রচার চালায়। বিশেষ করে রাস্তায় কার্পেটিংয়ের পর পিচ জমাট বাঁধতে স্বাভাবিক হতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ পিচ দেওয়ার এক-দুই দিন পরেই তা তুলে ফেলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা মেলে না। কিন্তু এমন অপপ্রচারে অহেতুক সরকারের দুর্নাম হয়।’