শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
চলতি জুন মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত যশোরে হত্যাকাণ্ড, রহস্যজনক মৃত্যু এবং লাশ উদ্ধারের আটটি ঘটনা ঘটেছে।
সংঘটিত হয়েছে অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ড। গলা কেটে, পিটিয়ে ও কুপিয়ে আবার কোথাও অন্তঃসত্ত্বা নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ এবং অর্থনৈতিক কারণে এসব হত্যাকাণ্ড বলে পুলিশি তদন্তে মিলেছে।
সর্বশেষ বুধবার (২৪ জুন) সকালে যশোর সদরের আরবপুর ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে নিজ বাড়ির পাশের একটি ঝোপ থেকে একাধিক মামলার আসামি সাইদ সরদার ওরফে ‘চশমা সাইদ’-এর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। পরদিন সকালে সাইদের গলাকাটা লাশ উদ্ধার হয়। লাশের পাশে রক্তমাখা চাকু পড়ে ছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মাদক ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার অথবা পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান বলেন, প্রাথমিকভাবে মাদক বেচাকেনা নিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িতদের বিষয়টি জানতে পেরেছে। তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, নিহত সাইদের বিরুুদ্ধে মাদকসহ ১৪টি মামলা রয়েছে।
গত ২১ জুন চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের পাশের একটি খাল থেকে আতিয়ার রহমান (৫৫) নামে এক নৈশপ্রহরীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার হয়। তিনি লস্করপুর গ্রামের ছবেদ আলীর ছেলে এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ছিলেন। ২০ জুন রাতে ডিউটিতে যাওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরদিন বিকেলে খালের কচুরিপানার নিচ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
বাঁওড়ে মাছ চুরিতে বাধা দেওয়ায় দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে মরদেহ খালে ফেলে রাখে। এ ঘটনায় র্যাব অভিযান চালিয়ে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া ওসমান ও সুজাউদ্দীন নামে আরও দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
১৭ জুন দিবাগত রাতে অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের ধলিরগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রিয়াজ হোসেন (২৯) নামে এক যুবককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
রিয়াজ ওই গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে।
পুলিশের তথ্যমতে, রিয়াজের বিরুদ্ধে ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদকসহ অন্তত ছয়টি মামলা ছিল।
পুলিশ হত্যাকাণ্ডের মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামি রাজু আহম্মেদ, ফজলু হোসেন ও ওবায়দুল ইসলাম মানিককে গ্রেপ্তার করেছে।
১৮ জুন মণিরামপুর পৌর এলাকার মোহনপুর ওয়াবদা মোড়ে বাবার বাড়ির নির্মাণাধীন একটি ঘর থেকে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাসলিমা খাতুন ময়নার (২৩)-মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের জেরে কয়েকদিন আগে তিনি বাবার বাড়িতে চলে এসেছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, দ্বিতীয় বিয়ে করার উদ্দেশ্যে তার স্বামী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশ নিহতের স্বামী হেলাল উদ্দিন এবং তার সৎ বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়।
২৫ মে ধান বিক্রির দরদাম নিয়ে বিরোধের জেরে বাঘারপাড়ার রায়পুর গ্রামের সাহাবির (২০) ছুরিকাঘাতে আহত হন। ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জুন ভোরে তিনি মারা যান।
৯ জুন ঝিকরগাছা উপজেলার শরীফপুর গ্রামে রেবেকা খাতুন (২৬) ও তার দেড় বছর বয়সী ছেলে সোহরাব হোসেনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের পরিবার এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে।
এ ঘটনায় রেবেকার স্বামী জনি মিয়াকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
একই সময়ে মণিরামপুরে নাতনিকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় ইমামুল হোসেন (৪৫) এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে একাধিক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। আতিয়ার রহমান হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ আলী, রিয়াজ হত্যা মামলার তিন আসামি রাজু আহম্মেদ, ফজলু হোসেন ও ওবায়দুল ইসলাম মানিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এছাড়া, তাসলিমা হত্যা এবং মা-শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে এবং আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। যেসব ঘটনার রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি, সেগুলোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।