যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

শিক্ষকদের কাছে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে মেসেঞ্জারে, টাকা তোলা হচ্ছে বিকাশে

খুলনা অফিস

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ জুন,২০২৬, ০৮:২০ পিএম
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৩ জুন,২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
শিক্ষকদের কাছে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে মেসেঞ্জারে, টাকা তোলা হচ্ছে বিকাশে

‘দ্রুত জমা দিন, কারণ জুন ক্লোজিং, অন্যান্য ক্লাস্টার আজ জমা দেবে, সব ক্লাস্টার একত্র করে আমাদের বিল-ভাউচার পাশ করাতে হবে, প্রতি বছর আমরা দিয়ে থাকি, এটা সবাই অবগত, মুজিবুর স্যারের সাথে যোগাযোগ বা স্যারের বিকাশে ৫১০ করে জমা দিলে হবে’- এভাবেই প্রতিটি ক্লাস্টারের মেসেঞ্জার গ্রুপে টেক্সট পাঠিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে।

আর এ টেক্সট দিচ্ছেন নগরীর গগন বাবু রোডস্থ খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায়। তিনি প্রাথমিকের সোনাপোতা ক্লাস্টারের চাঁদাবাজির দায়িত্বে নিয়োজিত। যার বিকাশে টাকা পাঠাতে বলছেন তিনি হলেন আব্দুল গনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান।

এভাবে কতিপয় শিক্ষকনেতা নামধারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন নগরীর ১২৬ স্কুলের শিক্ষকরা। পুরো থানা নিয়ন্ত্রণ করছেন নগরীর মহেশ্বরপাশা কেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিসুজ্জামান এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে রয়েছেন মহেশ্বরপাশা বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এসকে জামান। এ কারণে বাধ্য হয়েই সাধারণ শিক্ষকরা শিকার হচ্ছেন এ নীরব চাঁদাবাজির।

বছরের পর বছর ধরে মুখ বুজে তারা চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। আর এ চাঁদার ভাগ পৌঁছে যাচ্ছে- কয়েক শিক্ষকনেতা থেকে শুরু করে নগরীর সাতটি ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার (এটিইও) এবং থানা শিক্ষা অফিসারের (টিইও) পকেটে।

যার কারণে সাধারণ শিক্ষকরা মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছেন না। আর চাঁদা আদায়কারীরা কর্মকর্তাদের ‘খাস লোক’ হয়ে যাচ্ছেন। যথা সময়ে তাদের শ্রেণিকক্ষে দেখা না গেলেও টিইও-এটিইওদের পেছনে ঘুরঘুর এবং নিয়মিত অফিসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বেশ পারদর্শী তারা।

ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষকদের অভিযোগ, খুলনা সদরে সরকারি প্রাথমিকে চাঁদাবাজির এ চিত্র ১২৬টি স্কুলজুড়েই চলছে। এখন জুন ক্লোজিং, তাই চলছে বার্ষিক চাঁদাবাজি। এছাড়া গোল্ডকাপ ফুটবল, আন্তঃস্পোর্টস, বিদায় অনুষ্ঠান এমনকী পাঠ্যবই পরিবহনসহ নানা অজুহাতে বছরজুড়েই চলে চাঁদাবাজি। আর এসবের নেপথ্যে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক সমিতির কতিপয় নেতার হাত।

মূলত থানা শিক্ষা অফিসার এবং সহকারী থানা শিক্ষা অফিসারদের ম্যানেজ করতে এবং নিজেদের পকেট ভারি করতেই কতিপয় শিক্ষক নামধারী চাঁদাবাজ এগুলো করে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো নগরজুড়ে (প্রাথমিকের দলিলে সদর থানা) সাতটি ক্লাস্টার রয়েছে। ক্লাস্টারগুলো হচ্ছে- সোনাপোতা, সোনাডাঙা, বীণাপাণি, ফুলবাড়ী বিকে, আব্দুল বারী, স্যাটেলাইট টাউন এবং দক্ষিণ টুটপাড়া। এর মধ্যে সোনাপোতা ক্লাস্টারের দায়িত্বে রয়েছেন এটিইও নজরুল ইসলাম, সোনাডাঙা ক্লাস্টারে রত্না দেবনাথ, দক্ষিণ টুটপাড়া ক্লাস্টারে শর্মিষ্ঠা মন্ডল, আব্দুল বারী ক্লাস্টারে আফরোজা সুলতানা, বীণাপাণি ক্লাস্টারে কামরুন্নাহার, বিকে ক্লাস্টারে ফেরদৌসী আরা রেইনি। আর সোনাপোতা ক্লাস্টারে চাঁদা তোলার দায়িত্বে আছেন খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায় এবং আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান। এভাবে অন্যান্য ক্লাস্টারেও কিছু শিক্ষক চাঁদাবাজি করছেন।

সূত্র বলছে, থানা শিক্ষা অফিসে খেলাধূলার (গোল্ডকাপ) ঘাটতি এবং এজির (হিসাবরক্ষণ অফিস) ঘুস বাবদ ১২৬টি স্কুলপ্রতি ৫০০ টাকা করে ধার্য করা হয়। যে টাকা সোমবার (২২ জুন) আদায় করা হয়েছে। অথচ, একই খেলা বাবদ গত ৮ এপ্রিল ২০০ টাকা করে ১২৬টি স্কুল থেকে আদায় করা হয়। এর আগে ক্লাস্টার পর্যায়ে এ খেলার জন্য প্রথম দফায় চাঁদা নেওয়া হয় প্রতিটি স্কুল থেকে ৪০০ টাকা করে। যদিও এসব ইভেন্ট বাবদ প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থ বরাদ্দ থাকে।

তবে, ছোট-খাটো বিষয়ে থানা শিক্ষা দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে স্কুলগুলোতে নির্দেশনা প্রদান করা হলেও এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রমাণ না রাখতে কোনো ধরনের চিঠি ইস্যু করা হয় না।

এ চাঁদা আদায়ের জন্য অন্যান্য ক্লাস্টারের মতো সোনাপোতা ক্লাস্টারে মেসেঞ্জার গ্রুপে দ্রুত চাঁদা জমা দেওয়ার তাগাদা দিয়ে শিক্ষকদের টেক্সট পাঠান শিক্ষক প্রশান্ত রায়। একই গ্রুপে টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে অপর শিক্ষক মুজিবুর রহমান লেখেন, ‘এজি ও খেলাধুলা ঘাটতি বাবদ (৫০০/-) টাকা দিয়েছে। যেখানে খানজাহান আলী, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডি-আলী, পূর্ববানিয়াখামার, হ্যানে রেলওয়ে, প্রভাতী রেলওয়ে, রহিমা, বাগমারা, আব্দুল গনি, জাহানাবাদ, কয়লাঘাট, ভিক্টোরিয়া, নতুন বাজার, শিশু কল্যাণ, এপিসি, টুটপাড়া মডেলসহ এ ক্লাস্টারের অন্যান্য স্কুলগুলোর কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।’ এসব স্কুলের টাকা তার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মুজিবর।

শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল গনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান প্রথমে বিষয়টি বেমালুম অস্বীকার করে বলেন, কোনো চাঁদা নেওয়া হচ্ছে না। তবে, প্রমাণ আছে উল্লেখ করলে বলেন, খেলার ঘাটতি এবং এজি অফিস বাবদ চাঁদা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটু ঝামেলা হওয়ায় আর নেওয়া হচ্ছে না।

কী ঝামেলা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ দেয়, কেউ দিতে চায় না- এসব কারণে নেওয়া হচ্ছে না। তবে, চাঁদার পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, ‘প্রশান্ত স্যার জানেন।’

অভিযোগে আরও জানা গেছে, নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং নতুনবাজার স্কুলের প্রধান শিক্ষক অবসর গ্রহণ করেছেন। তাদের বিদায় অনুষ্ঠান করার জন্য এটিইও নজরুল ইসলাম কতিপয় শিক্ষকনেতার উসকানিতে ক্লাস্টারের ১৬০ জনেরও বেশি শিক্ষকের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ৩০০ টাকা ধার্য করেন। এই অর্ধ লাখ টাকা প্রতিটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে তুলে এটিইওকে দিতে বলা হয়। এ জন্য গত ১১ মে নগরীর টুটপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিটিং করে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া গত ১৩ জুন আব্দুল গনি সপ্রাবি থেকে ১১টি বই আনা বাবদ ২০টি স্কুল থেকে ৪০ টাকা করে চাঁদা তোলেন এটিইও নজরুল। একই বই ৪ জুন থানা শিক্ষা অফিস থেকে আনতে দশ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এভাবেই নানা অজুহাতে চাঁদা আদায় চলছে। যা অনেকটাই ওপেন সিক্রেট।

এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় দিনদিন চাঁদাবাজির হারও বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চাঁদা তোলার বিষয়টি যথারীতি সোনাপোতা ক্লাস্টারের এটিইও নজরুল ইসলামও অস্বীকার করেছেন। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ক্লাস্টারে খেলার জন্য চার হাজার টাকা করে বরাদ্দ ছিল। এ টাকা অপ্রতুল বলে স্বীকার করলেও ‘চাঁদা তোলা হয়নি দাবি করে’ তিনি বলেন, ওই টাকা দিয়েই খেলা সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া এ বিষয়ে কিছুই জানেন না দাবি করে তিনি প্রশিক্ষণে রাজধানীতে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন।

থানা শিক্ষা অফিসার (টিইও) মো. শাহজাহান বলেন, এ বিষয়টি জানা নেই। তবে প্রমাণ আছে জানালে বলেন, ‘বিষয়টি দেখছি।’

খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, জেলা অফিসে কোনো ঘুস বা চাঁদার কারবার নেই। ফলে অন্য কারও এ ধরনের অনৈতিক কাজ করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে তিনি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানান।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)