জুলফিকার আলী কানন
, মেহেরপুর
জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেহেরপুরের মেহেরসাগর কলার সুনাম এখন দেশজুড়ে। জেলার বিভিন্ন হাট থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার কলা যাচ্ছে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ দেশের নানা প্রান্তে।
গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর ও জেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠ থেকে সরাসরি কলা কিনতে আসছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফড়িয়া ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। ফলে লাভবান হচ্ছেন চাষি ও ব্যবসায়ী উভয়েই।
গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর কলার হাট এখন জেলার অন্যতম বৃহৎ কলা বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় কেনাবেচা। স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে কলা এনে জড়ো করেন হাটে। এরপর সেখান থেকেই ট্রাকভর্তি যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। শুধু এ হাট থেকেই প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার কলা বিক্রি হচ্ছে।
মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক কলা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। কলাকে ঘিরে মেহেরপুরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে কলার চাষ হয়েছে। এ মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন। যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা।
মেহেরসাগর কলার পাশাপাশি জেলায় ব্যাপক আকারে চাষ হচ্ছে চাপা, সবরি ও রং কলা।
গাংনীর হেমায়েতপুর গ্রামের কলাচাষি শাজাহান আলী ও নুর মহাম্মদ বলেন, স্থানীয়ভাবে কলার হাট গড়ে ওঠায় এখন আর দূরের বাজারে যেতে হচ্ছে না। পরিবহন খরচ কমার পাশাপাশি ন্যায্য মূল্যও পাচ্ছি। এতে কলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
সোনাপুর গ্রামের আব্দুর রহিম বলেন, একবার কলার গাছ রোপন করলে এক নাগাড়ে কখনো তিনবার আবার কখনো দুইবার ফসল পাওয়া যায়। এক বিঘা জমিতে চারশ’ থেকে সাড়ে চারশ’ কলার চারা রোপন করা যায়। তিনি বলেন, লাভজনক চাষ বিধায় এই অঞ্চলের কৃষকরা দিনদিন আরও আগ্রহী হচ্ছেন।
আশরাফপুর গ্রামের ছাদ আলী বলেন, এক সময় এই এলাকার চাষিরা ধান, পাট, গমসহ অন্যান্য আবাদ করতো। আবাদ শেষে লাভের চেয়ে লস হতো বেশি। তাই তারা ধান পাটের আবাদ ছেড়ে কলাসহ অন্যান্য সবজিচাষে ঝুঁকছেন। এই এলাকার মাঠের পর মাঠজুড়ে এখন কলা চাষ হচ্ছে। প্রতি সিজনে প্রচুর পরিমাণ লাভ করছেন চাষিরা। এক বিঘা জমিতে সব খরচ-খরচা বাদ দিয়ে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা লাভ হয় বলে জানালেন এই কলাচাষি।
ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জ জেলার জামাল হোসেন বলেন, সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে কলা সংগ্রহ করি। এতে সহজে কেনা যায়, লাভও বেশি। মেহেরপুরের কলা সারাদেশের বাজারে চাহিদা রয়েছে। শুধু আমি নয়, সিরাজগঞ্জের ১০-১৫ জন হেমায়েতপুর হাট থেকে পাইকারি দরে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কলা কিনে নিয়ে যায়।
বরিশালের আড়ত ব্যবসায়ী ফুরকান মিয়া বলেন, প্রতিদিন এক-দুই ট্রাক কলা কিনি। এখানকার কলা বিষমুক্ত নিরাপদ ও স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। তাই দেশের বাজারে এই কলার চাহিদা প্রচুর।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সঞ্জীব মৃধা বলেন, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এখানকার মেহেরসাগর কলা ইতোমধ্যে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। জিআই ট্যাগ লাগানোর অনুমতিও পেয়েছি। আমরা কৃষকদের গ্রুপভিত্তিক সম্পৃক্ত করছি। জিআই ট্যাগের ব্রান্ডিং কাজে লাগিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও মেহেরসাগর কলার মূল্যমান বৃদ্ধি পাবে।