আনোয়ার হোসেন
, মণিরামপুর (যশোর)
ভূমিহীনদের জন্য নয়টি ঘর নির্মিত হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টেরর আগে ভূমিহীনদের ঘরের জন্য ইট পড়েছিল যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়ের সরসকাঠি ও বাগডোব এলাকার নির্ধারিত খাস জমিতে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর মাস দুয়েক কাজ বন্ধ ছিল। এরপর সরসকাঠি মৌজায় সাতটি ও বাগডোব মৌজায় দুইটি ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তর।
২০২৪ সালের শেষের দিকে ঘর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর পার হয়েছে প্রায় দেড় বছর। ঘরগুলোয় বিদ্যুতের মিটার স্থাপন করা হয়েছে বেশ আগেই। বসবাসের উপযোগী করে তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। তালিকাভুক্ত ভূমিহীনদের আজও বুঝিয়ে দেয়া হয়নি ঘরগুলো।
রোহিতা ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণের আগে ওই ইউনিয়নের প্রকৃত ভূমিহীনদের তালিকা করে স্থানীয় ভূমি অফিস। পরে তালিকা এসিল্যান্ড অফিসে জমা দিলে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তবে, তালিকাভুক্ত সেইসব মানুষ অন্যের আশ্রয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, ঘরগুলো তালিকাভুক্তদের বুঝিয়ে না দিলে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সরসকাঠি এলাকার ঘরগুলো রয়েছে অরক্ষিত। সন্ধ্যা নামলে এখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। ঘরের তালা ভেঙে সেখানে নিয়মিত আড্ডা বসায় মাদকসেবীরা।
১৬ জুন সরেজমিনে দেখা গেছে, এক স্থানে পূর্ব ও পশ্চিমে দুই পাশে নির্মিত মুখোমুখি আশ্রয়ণের সাতটি ঘর খালি পড়ে আছে। যারমধ্যে চারটি ঘর খোলা। ঘরের কোণে পড়ে আছে নেশাদ্রব্য পানের সরঞ্জাম। টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। একটি ঘরে বিচালি (গো খাদ্য) ভরে রাখা হয়েছে। একটির বারান্দায় রান্নার জ্বালানি স্তূপ করা।
কথা হয় তালিকাভুক্ত ভূমিহীন কাশিমপুর গ্রামের ওমর আলীর ছেলে ভ্যানচালক রাজু আহম্মেদের সাথে। তিনি বলেন, ‘বাবা গ্রামের এক ব্যক্তির আমবাগান পাহারা দিতেন। ভূমিহীন বিধায় সেই আমবাগানেই আমরা সবাই থাকতাম। তিনি মারা যাওয়ার পরও সেখানে রয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘শুনেছি আমার জন্য সরসকাঠি চটপটি মোড়ে একটা ঘর তৈরি হয়েছে। অনেকদিন নায়েব অফিসে হাঁটিছি। কিন্তু ঘর পাইনি।’
সরসকাঠি-কাশিমপুর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন বলেন, সরসকাঠি চটপটি মোড়ে দুই সারিতে সাতটি ঘর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের শেষের দিকে। মাস ছয়েক আগে ঘরগুলোয় বিদ্যুতের মিটার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আজও তালিকাভুক্ত ভূমিহীনদের ঘরগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
বিল্লাল হোসেন বলেন, চটপটি মোড়ের ঘরগুলোর মধ্যে চারটির তালা ভাঙা। রাত হলে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। রাতে স্থানীয় লোকজন মোড়ে যেতে ভয় পায়।
রোহিতা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, ‘এই ইউনিয়নে আশ্রয়ণের ১৩টি ঘর নির্মাণের কথা ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঠিকাদার নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। তখন জমির স্বল্পতার কারণে সরসকাঠিতে সাতটি ও বাগডোবে দুটি ঘর নির্মিত হয়েছে। ভূমিহীনদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে ঘর বরাদ্দের জন্য ১২ জনের তালিকা এসিল্যান্ড অফিসে জমা দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগে। এরপর ঘরগুলো তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। আমি মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখি ঘর তালামারা অবস্থায় আছে।
এক প্রশ্নের জবাবে নায়েব বলেন, সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়টি জানা নেই। তালা খোলা থাকলে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্রাট হোসেন বলেন, আশ্রয়ণের ঘরগুলো যাদের নামে বরাদ্দ, তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এসিল্যান্ডকে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কশিনার (ভূমি) মাহির দায়ান বলেন, ‘সরসকাঠি ও বাগডোবের আশ্রয়ণের ঘরগুলোর বন্দোবস্ত হয়ে এসেছে ২০২৩-২৪ সালে। তারপরও কেন ঘরগুলো তালিকাভুক্ত ভূমিহীনদের বুঝে দেওয়া হয়নি, এটা আমার কাছে স্পষ্ট না। ইউএনও স্যার আমাকে বিষয়টি জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দ্রুত ঘরগুলো তালিকাভুক্ত আবেদনকারীদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’