এম জুবায়ের মাহমুদ
, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মাপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি কোনো পদে কর্মরত নন জাহাঙ্গীর হোসেন বাবু। অথচ, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
মিউটেশন, নামজারি, খাজনা, ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা থেকে শুরু করে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার সরেজমিনে পদ্মাপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর হোসেন বাবু অফিসের বিভিন্ন কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময় বিভিন্ন সেবাগ্রহীতাকে তার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করতে দেখা যায়।
সরকারি কর্মচারী না হওয়া সত্ত্বেও তার এমন সক্রিয় উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে পদ্মাপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অবস্থান করছেন বাবু। সরকারি কর্মচারী না হয়েও তাকে অফিসের কাগজপত্র দেখা, আবেদনপত্র গ্রহণ, ফাইলপত্র নিয়ে কাজ করা এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করে আসছেন। এমনকি অফিসে বসে মানুষের ভূমি-সংক্রান্ত কাজের তদারকি করতেও দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পদ্মাপুকুর এলাকার বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, বাবু অফিসের কেউ না। কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ না করলে অফিসের কোনো কাজ সহজে হয় না। অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়েই তার শরণাপন্ন হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসে আগত সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন সময় বাবুর মাধ্যমে কাজ করতে বলা হয়। ফলে, সরকারি অফিসে একজন বহিরাগত ব্যক্তি কীভাবে এতটা প্রভাব বিস্তার করছেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে, বাবুর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বালু উত্তোলনকারী বলেন, আমরা বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেই বালু উত্তোলনের কাজ করি। তার মাধ্যমেই অফিসের যারা আছে তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়। এরপর আর কোনো সমস্যা হয় না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে ফুটপ্রতি চুক্তির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নের যেখানেই অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনা ঘটে এবং বিষয়টি নায়েবকে জানানো হয়, সেখানেই নায়েব মোশাররফ হোসেন নিজে না গিয়ে বাবুকে পাঠান। ফলে, তিনি নিজেকে ভূমি অফিসের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন।
গত ২২ মে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর এলাকার সেকেন্দার নামে এক ব্যক্তি চাউলখোলা গ্রামে বালু উত্তোলন করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নায়েবকে জানানো হলে ঘটনাস্থলে বাবুকে যেতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই সময় সেকেন্দারের ছেলে মোবারক বাবুকে উদ্দেশ করে বলেন, সন্ধ্যায় আব্বা আপনার সঙ্গে দেখা করবে। এ কথা শোনার পর বাবু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং মোবারকের সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় আবজাল, আল আমিন, ইকবলসহ কয়েকজনের দাবি, পদ্মাপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বাবুর নিয়মিত উপস্থিতি এবং বিভিন্ন কাজ পরিচালনার ছবি ও ভিডিও রয়েছে। এছাড়া, অবৈধ বালু উত্তোলনের স্থানেও তার উপস্থিতির ভিডিও ও স্থিরচিত্র সংরক্ষিত আছে।
প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি চাকরিতে না থেকেও কীভাবে একজন ব্যক্তি বছরের পর বছর একটি সরকারি অফিসের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকেন। কার ক্ষমতাবলে অফিসের নথিপত্র ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কাজ করেন। আবার অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠলে কেন তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি আগে অফিসে যেতাম, এখন যাই না। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা।’
তবে, তার ভূমি অফিসে অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের ছবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অস্পষ্ট জবাব দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কথোপকথনের মধ্যেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে পদ্মাপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব মোশাররফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে উল্টো ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমি কোনো কথা বলবো না।’
অভিযোগের বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের ওখানে সরকারি পোস্টে দুইজন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর বাইরে কেউ যদি এভাবে অফিসের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।