আনোয়ার হোসেন
, মণিরামপুর (যশোর)
মণিরামপুর পৌরসভা এলাকার মহাদেবপুর গ্রামে এক স্থানে ভূমিহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৬টি ঘর নির্মিত হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। নির্মাণ কাজ শেষে উপকারভোগীদের ঘরগুলো বুঝিয়ে দিতে ২০২৫ সালের প্রথম মাসে এসিল্যান্ডকে চাবি হস্তান্তর করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তর।
এরমধ্যে পেরিয়ে গেছে দেড় বছর। আজও উপকারভোগীদের মাঝে ঘরগুলো হস্তান্তর হয়নি। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ঘরগুলো হয়ে উঠেছে এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়। তাদের কারণে কয়েকটি ঘর হয়ে পড়েছে বসবাসের অনুপযোগী।
মহাদেবপুরের আবাসন প্রকল্পটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে আতঙ্ক।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পঞ্চম ধাপের শেষপর্যায় এক কোটি ৮৮লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ে মণিরামপুরে ভূমিহীনদের জন্য ৬২টি ঘর নির্মিত হয়েছে। যারমধ্যে মহাদেবপুরে ৩৬টি, রোহিতা ও গোবিন্দপুরে নয়টি করে ১৮টি এবং শেখপাড়া খানপুর ও চালুয়াহাটির হরিসপুরে চারটি করে আটটি ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ চার হাজার পাঁচশ’ টাকা।
পিআইও দপ্তর বলছে, ঘরগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ ও নলকূপ স্থাপনের জন্য ২০২৫ সালে ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত তামান্না ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাইফুল ইসলাম যৌথ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য দপ্তরকে দেওয়া হয়। একই দিনে এসিল্যান্ডের কাছে ৬২টি ঘরের চাবি হস্তান্তর করা হয়। যা ওই চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসাথে নির্মিত এই ঘরগুলোর কোনটিই এখন পর্যন্ত উপকারভোগীদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়টি কোনোটিতে। দুই একটি স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন করা হলেও দেওয়া হয়নি বিদ্যুৎ সংযোগ।
মণিরামপুর-ঢাকুরিয়া সড়কের জয়পুর কাছারিবাড়ি মোড় হতে পূর্বদিকে ইটের একটি সলিং রাস্তা নেমে এসেছে। সেই রাস্তা ধরে জয়পুর মান্দারতলা ঈদগাহ হয়ে কাঁচা রাস্তা বয়ে কিছু দূর এগিয়ে দক্ষিণ দিকে তাকালে চোখে পড়ে মহাদেবপুর মৌজায় নির্মিত রঙিন টিনের সারি সারি ৩৬টি আধাপাকা ঘর। যার উত্তর ও পূর্বপাশে রয়েছে ফসলের মাঠ।
সম্প্রতি সরেজমিন মহাদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেখা গেছে, পাঁচ সারিতে নির্মিত ঘরগুলো বসতিশূন্য পড়ে আছে। তারমধ্যে নয়টি ঘরের তালা ভাঙা। অধিকাংশ ঘরের বারান্দায় গোবর শুকিয়ে আছে। একটি ঘরের বারান্দায় রয়েছে গরু বাঁধা। দেখে মনে হয়, এটি কোনো আবাসন প্রকল্প নয়, সারি সারি গোয়ালঘর। আবার কয়েকটি ঘরে রাখা হয়েছে জ্বালানি খড়কুটো। একটি ঘরে আগুন দেওয়ার নমুনা পাওয়া গেছে।
এ সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কৃষক জানিয়েছেন, দেড় বছর আগে ঘরগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও কাউকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মাদকসেবীদের দখলে থাকে আশ্রয়ণ পল্লীটি।
শনিবার (২০ জুন) দুপুরে ঘটনাস্থ থেকে এসিল্যান্ড মাহির দায়ান আমিনের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে। তিনি মহাদেবপুরে আশ্রয়ণের হস্তান্তর না হওয়া কোনো ঘরের তথ্য দিতে পারেননি। পরে এই প্রতিবেদকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিকেলে তিনি মহাদেবপুরের আবাসন প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন।
তারপর তিনি শেষপর্যায়ে নির্মিত ৫০টি ঘর হস্তান্তর না হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেন।
জয়পুর গ্রামের নাজমা বেগম বলেন, ‘আমার মা বেছুরেন্নেছা তার বাবার সূত্রে মহাদেবপুর মৌজায় দেড় বিঘা জমি পেয়েছিলেন। সেই জমি পরে খাস হয়ে গেলে তাতে ৩২টি ঘর করেছে সরকার। আমরা পাঁচ ভাইবোন। জমিজমা না থাকায় মামার ভিটায় থাকি। জমি নেওয়ার সময় ইউএনও আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে পাঁচটি ঘর দেবেন বলেছিলেন। ঘরের কাজ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। কাগজপত্র না দেওয়ায় আমরা ঘরে উঠতে পারিনি। সবঘর খালি পড়ে আছে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের যেসব ঘর হস্তান্তর করা হয়নি, ধাপেধাপে সেগুলো সম্পন্নের কাজ চলছে। চলতি সপ্তাহে ১১টি ঘর হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
এসিল্যান্ড বলেন, ‘ঘর হস্তান্তরের কাজ বিলম্ব হওয়ার কথা আমি স্বীকার করছি। এর কারণ হচ্ছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং আমার দপ্তরের যারা ফাইলগুলো দেখাশুনা করতেন, তাদের অনেকে এখানে নেই। অনেক নায়েবের বদলি হয়েছে। তারা যাদের ফাইলগুলো বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন, তাদের অনেকে এখন নেই। আশা করছি, জুলাই মাসের মধ্যে তালিকা ধরে উপকারভোগীদের ঘরগুলো বুঝিয়ে দিতে পারবো।’