রাব্বি আল-আমিন
, যশোর
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীদের প্রত্যাশা থাকে বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার। কিন্তু যশোর জেনারেল হাসপাতালে সেই প্রত্যাশা এখন অনেকটাই দূরাশা। রোগীদের হাতে কেবল তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রেসক্রিপশন, আর ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেও মিলছে না কোনও প্রতিকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোর ছাড়াও ঝিনাইদহ, নড়াইল ও মাগুরাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলার লাখো মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল যশোর জেনারেল হাসপাতালটি। আড়াইশ’ বেডের এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ছয়শ’ রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া, বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা। আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে বছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার ওষুধের চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ আসে মাত্র আট কোটি টাকা। ফলে, প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় অংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রোগীদের প্রায় ৮৯ শতাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, গত অর্থবছরে হাসপাতালে ওষুধের চাহিদা ছিল ৫৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকার। এর মধ্যে বহির্বিভাগের ফার্মেসিতে চাহিদা ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৫ টাকা ও আন্তঃবিভাগের ১৯ ওয়ার্ডে চাহিদা ছিল ৪২ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৪৭৫ টাকা। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানটি আট কোটি ২৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকার ওষুধ ক্রয় করে। সরকারিভাবে ১১২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে আসে ৮২ ধরনের ওষুধ। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় অর্থে টেন্ডারের মাধ্যমে অবশিষ্ট এক কোটি ৫৬ লাখ টাকায় ৩০ ধরনের ওষুধ কেনা হয়। টেন্ডারে কেনা ওষুধ দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নেই হাসপাতালে। কয়েকটি অর্থবছরে ওষুধ ক্রয়ে চাহিদার মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে অতি প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক, স্যালাইন ও গুরুত্বপূর্ণ ইনজেকশন শেষ হয়ে গেছে। একশ’ শয্যার বরাদ্দ দিয়ে আড়াইশ’ শয্যার হাসপাতাল চালাতে হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় কয়েক মাস পরই ওষুধ ফুরিয়ে যায়।
মণিরামপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা অনিল রায় বলেন, চারদিন ধরে এখানে ভর্তি আছি। এ পর্যন্ত নাপা ছাড়া কোনও ওষুধ পাইনি। প্রতিদিন বাইরে থেকে অনেক টাকার ওষুধ কেনা লাগছে। আমরা গরিব মানুষ এই হাসপাতালে সেবা নিতে আসি। কিন্তু বেশিরভাগই ওষুধ বাইরে থেকে কেনার কারণে অনেক কষ্টে আছি। যদি সরকার ন্যূনতম কিছু ওষুধ দিতো তাহলে আমাদের মতো গরিব মানুষের বেশ উপকার হতো।
বারবাজার-সাতমাইল থেকে আসা রোগীর স্বজন সেলিনা খাতুন স্মৃতি বলেন, শাশুড়িকে এখানে ভর্তি করে আছি ১৮ দিন। তার চিকিৎসার বেশিরভাগই ওষুধ বাইরে থেকে কিনেছি। এ পর্যন্ত প্যারাসিটামল ওষুধসহ দু’এক প্রকার ওষুধ দিয়েছে। অপারেশন বা ইনফেকশনের জন্য যেসব দামি ইনজেকশন ও এন্টিবায়োটিক দিতে হয়, সেগুলো বাইরে থেকে কেনা লাগে। নার্সদের কাছে কোনও ওষুধ চাইতে গেলেই বলে- সাপ্লাই নেই।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটের কারণে রোগী ও স্বজনদের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন নার্সরা।
সিনিয়র স্টাফ নার্স জেসমিন খাতুন বলেন, যেসব রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসে বেশিরভাগই গরিব। বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ পাবে- এ আশা নিয়ে এখানে আসে। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারছি না। এ কারণে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে বলা হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনরা আমাদের পরে অনেক সময় ক্ষিপ্ত হচ্ছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, যশোরসহ আশপাশের জেলার লোকজন এখানে চিকিৎসা নিতে আসার কারণেই ওষুধের ঘাটতি দেখা দেয়। কারণ সরকার অন্যান্য জেলা হাসপাতালে যেমন বরাদ্দ দেয়, আমরাও তেমন বরাদ্দ পাই। অন্য জেলার লোকজন এই হাসপাতালে আসায় ওষুধ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পাশের জেলার হাসপাতালের ওষুধ মজুদ থাকছে।
তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব টেন্ডার করে মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা করবো। আমরা অতিরিক্ত চাহিদা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।