সম্পাদকীয়
গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসন নিয়ে ইতিহাস গড়া ফলাফলের মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসে। দলটির সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ ও বাইরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল জনমানসে। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যে তাদের কমপক্ষে ছয় সংসদ সদস্যের (এমপি) বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জামায়াত বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। বেফাঁস মন্তব্য, অনিয়ম এবং সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভিডিওর ঘটনা দলটির ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করছে। বিব্রতকর এ পরিস্থিতি দলটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
গেল মার্চে কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ও তার প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরবর্তীতে তিনি জামিন পেলেও দলকে অস্বস্তিতে ফেলেন।
বাজেট অধিবেশনে আমির হামজার মুখ থেকে ‘২০০ কোটি টাকা’ ও ‘ছয় হাজার কোটি টাকা’ বাজেটের যে বক্তব্য আসে, যা হাসির খোরাক যোগায়। পরে তিনি তার ভুল বলে স্বীকার করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান সংসদে বক্তৃতা দিয়ে তার সরকারি ফ্ল্যাটে ‘ওয়াশিং মেশিন’ ও ‘মাইক্রোওভেন’ দাবি করে ব্যাপক সমালোচিত হন। তার এ বক্তব্য নিয়ে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ বিদ্রুপ করতে ছাড়েননি।
নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আব্দুল মুনতাকিম মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের অবদান নিয়ে বক্তব্য দেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় তার বাবা জীবিত এবং তার নিজের জন্ম ১৯৮১ সালে। এ মিথ্যা বক্তব্যে তিনি সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ট্রলের শিকার হন এবং নিজ বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারের কাছে চিঠি দেন।
নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে বরাদ্দের তালিকায় তার নিজ মেয়ের নাম উঠে আসে দুই দুইবার। তীব্র সমালোচনার মুখে এই ঘটনার দায় তিনি ব্যক্তিগত সহকারীর ওপর চাপান এবং তাকে বরখাস্ত করেন।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরীকে নিয়ে তার ব্যক্তিগত সহকারীর সাথে অডিও ফাঁস হয়, যেখানে ‘পায়ে গুলি’ করার হুমকির মতো কথোপকথন ছিল।
সর্বশেষ ও সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিস শূরার সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে। তার সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হলে বিতর্কের ঝড় ওঠে। গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তিনি ১৮ বছর বয়সী ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন। তবে ভাইরাল হওয়া জীবনবৃত্তান্তে তার স্বাক্ষর থাকা এবং তাতে তরুণীকে ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ থাকায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
এরই মধ্যে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ ওঠে। তার সাবেক গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী দাবি করেছেন, তিনি নানা অনৈতিক কাজের সাক্ষী থাকায় এমপির নির্দেশে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত জামায়াত দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলটি তাদের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও এর আগে ঘটে যাওয়া অন্যান্য বিতর্কগুলোতে জড়ানো এমপিরা বহালতবিয়তে আছেন।
গত পাঁচ মাসে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জামায়াত এমপিদের এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে তাদের দৃঢ় নৈতিকতার ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। দলটি যদি ভবিষ্যতে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে চায়, তবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তাদের আরও কঠোর ও দৃশ্যমান শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা রাজনৈতিক মাঠে অর্জিত শক্তি বিসর্জনেও অনেক সময় লাগবে না।