খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সব ভবনে তালা ঝুলিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের দাবির গভীরে গেলে একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায়, শিক্ষার্থীরা কেবল ওই ক্যাম্পাসের কয়েকটি নির্দিষ্ট অভিযোগের বিচার দাবি করছেন না, তারা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন চলে আসা এক অনাচারের নিগড় ভাঙার চেষ্টা করছেন। কারণ যৌন হয়রানির অভিযোগ শুধু খুবিতেই নয়, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সবগুলোতে বিরাজমান এবং এনিয়ে বিভিন্ন সময় ক্যাম্পাসগুলোতে দানা বেঁধেছে আন্দোলন। কিন্তু ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন আন্দোলন বৃহত্তর পরিসরে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি। ফলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য জাগরণের একটি আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
খুবির ঘটনাপ্রবাহ দেখে বোঝা যায়, এটি কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ নয়। গত বছর আগস্টে অধ্যাপক ড. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে, পরে ড. মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এবং সম্প্রতি ক্যান্টিনকর্মী ইমাম হাসানের জঘন্য কাণ্ড- একটির পর একটি ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠানটিতে যৌন হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, অভিযোগগুলোর তদন্ত হয়েছে, কিন্তু শাস্তি হয়েছে আংশিক ও অপ্রতুল। অধ্যাপক রুবেল আনছারকে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়নি। অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে সরানো হয়েছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা এখনো নেই। এই আধা-শাস্তি অভিযুক্ত ও সম্ভাব্য অপরাধীদের সাহস বাড়ায় এবং ভুক্তভোগীদের মনোজগতে গভীর আঘাত হানে।
প্রশাসন যে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, তেমনটি নয়। তবে শিক্ষার্থীরা তা সময়ক্ষেপণ বলে মনে করছেন। তদন্ত কমিটি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল এবং পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করছেন শিক্ষার্থীরা। পদ্ধতি ও আইনি মারপ্যাঁচ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। আইনি জটিলতার কর্তৃপক্ষীয় ভাষ্যকে তারা প্রশাসনের পুরনো কৌশল হিসেবে মূল্যায়ন করেন। কারণ, আইন কখনো ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
ক্যান্টিনকর্মী ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হওয়া ইতিবাচক দিক। কিন্তু ভুক্তভোগী ছাত্রীদের মানসিক আঘাত এবং ক্যাম্পাসে তাদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি কীভাবে লাঘব করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ছাত্রী হলের ক্যান্টিনে পুরুষ কর্মী না রাখা, মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা- এই সিদ্ধান্তগুলো প্রতিরোধমূলক হলেও প্রতিক্রিয়াশীল। পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার হলে আজ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগতো না।
শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করলে পরিণতি কী হয় তা আমরা নিকট অতীতে দেখেছি। সেকারণে আমরা বলবো, দাবি পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা সময়ক্ষেপণের কোনো চিন্তা যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করে থাকে, তাহলে এটি ভুল পদক্ষেপ। বরং শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে উন্মুক্ত সংলাপের মাধ্যমে ছাত্রীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের একটি বড় সুযোগ প্রশাসনের সামনে রয়েছে। প্রশাসনের উচিত সেই সুযোগ গ্রহণ করে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যা শিক্ষার্থীদের কাছে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়।
শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস বন্ধ করে দিয়েছেন- একথা সত্য। কিন্তু তারা এসেছেন শিক্ষা গ্রহণ করতে। নিশ্চয় তারা শিক্ষাগ্রহণের পথকে রুদ্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাদের পদক্ষেপের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিঃসন্দেহে প্রশাসনের ঘুম ভাঙানো, একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা; যাতে শুধু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অন্যান্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরাও নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারেন। আমরা শিক্ষার্থীদের এই সৎ সাহসকে সম্মান জানাই। ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলন নিশ্চয় ব্যর্থ হবে না।
নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, এটি শিক্ষক, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সময় এসেছে সবাইকে সেই দায়িত্ব নেওয়ার।