সম্পাদকীয়
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের শৈলকুর বিলে অপরিকল্পিত মৎস্য ঘেরের কারণে সৃষ্ট স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিয়ে রোববারের দৈনিক সুবর্ণভূমিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন পড়ে বোঝা যায়, সুপরিকল্পিত জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে মাগুরা, কৈখালী, তালতলা, গোপীনাথপুরসহ অন্তত দশ গ্রামের হাজারো মানুষের জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থা প্রতিবছরই হচ্ছে। অথচ এর স্থায়ী সমাধানে প্রশাসনের তৎপরতা যথেষ্ট নয়।
শৈলকুর বিলের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল বেতনা নদী ও কুলুটিয়া-গোপীনাথপুর খালের মাধ্যমে। কিন্তু গত সাত-আট বছরে ১৫-১৬টি বাণিজ্যিক মাছের ঘের নির্মাণের ফলে নিষ্কাশন ব্যবস্থা রুদ্ধ হয়ে গেছে। ঘের মালিকেরা প্রতি বছর বর্ষার আগে বেড়িবাঁধ উঁচু করে, যাতে তাদের ঘেরে পানি থাকে এবং তা প্লাবিত হয়ে মাছ বেরিয়ে না যায়। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই লোকালয়, স্কুল, মাদরাসা, কৃষিজমি, এমনকি পাকা সড়ক পর্যন্ত তলিয়ে যায়। স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে অসহায় বৃদ্ধ, নারী- সবার চলাচল বন্ধ হয়ে এক দুর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। গ্রামবাসীর পুকুরের মাছ ভেসে যায়, বাড়িতে জমে থাকা পানি চার-পাঁচ মাস ধরে চর্মরোগ, স্যানিটেশন সংকট ও সাপ-পোকার উপদ্রব বাড়ায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নারী ও শিশুরা, যাদের মৌলিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার অধিকার অনিশ্চিত হয়ে যায়।
অপরিকল্পিত ঘেরের ফলে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের মাগুরা-গোপীনাথপুর ও বিনেরপোতা অংশ এবং লাবসা মোড় পর্যন্ত বাইপাস সড়কের পিচ উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, এটি শুধু গ্রামীণ জনপদের সমস্যা নয়, এই জলাবদ্ধতা আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করছে। ঘেরমালিকদের একজন কামরুজ্জামান স্বীকার করেছেন, ঘেরের বেড়িবাঁধ কেটে দিলেই প্রায় চার হাজার মানুষ তাৎক্ষণিক মুক্তি পাবে। তাহলে কেন সেই বাঁধ কাটা হচ্ছে না? তারপরও কেন মাত্র কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বাণিজ্যিক স্বার্থ হাজারো মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
মাছ চাষ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু তা হতে হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে, জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। কোনো বিলের পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ধারা বন্ধ করে সেখানে ঘের করা মানে আশপাশের মানুষের সর্বনাশ। যেকোনো বিবেচনায় এটি অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের ঘেরের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র ও পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেছেন, স্থানীয় বৈঠকে সমাধান না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ঘেরের বাঁধ কাটা হবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই সমস্যা মাথাচাড়া দিলেও কেন স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রশাসনের পূর্বপ্রস্তুতি থাকে না? কেন ঘেরগুলো নির্মাণের সময়ই নিয়ন্ত্রণ করা হয় না?
আমরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি, শৈলকুর বিলের সব ঘেরের বেড়িবাঁধ তাৎক্ষণিকভাবে কেটে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন পুনরুদ্ধার করুন, যাতে আগামীকাল ভারি বৃষ্টি হলেও নতুন করে দুর্ভোগ তৈরি না হয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য ঘেরগুলোর কারিগরি ও পরিবেশগত জরিপ করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। যে ঘেরগুলো নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিনষ্ট করছে, সেগুলো অপসারণ বা পুনর্নকশা করুন। ভবিষ্যতে যেন কোনো অপরিকল্পিত ঘের না তৈরি হতে পারে, তার জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ঘের নির্মাণে আইন ও বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করুন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে নারী-শিশুদের সুরক্ষায় উদ্যোগ নিন।
বৃষ্টির পানি আমাদের আশীর্বাদ। কিন্তু সেই পানি যদি মনুষ্যসৃষ্ট কারণে দীর্ঘদিন লোকালয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে। আমরা দেখতে চাই জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসন তার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে।