যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

নজরুলবর্ষ

কবি নজরুলের বিশ্ববীক্ষা এবং বর্তমান দুনিয়ার দিশা

বেনজীন খান

প্রকাশ : রবিবার, ২৬ জুলাই,২০২৬, ১২:০০ পিএম
কবি নজরুলের বিশ্ববীক্ষা এবং বর্তমান দুনিয়ার দিশা

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সাধারণত ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু তার সাহিত্য, দর্শন ও জীবনচর্চার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, কেবল বিদ্রোহই তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়; বরং বিদ্রোহ ছিল একটি বৃহত্তর মানবিক বিশ্বদর্শন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। নজরুলের বিশ্ববীক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘মানুষ’- তার স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা, সাম্য, প্রেম এবং ন্যায়বিচার। তাই তিনি কেবল বাংলার কবি নন; তিনি বিশ্বমানবের কবি।

নজরুলের সাহিত্য কোনো একক ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়। তিনি ইসলামি ঐতিহ্য থেকে যেমন শক্তি গ্রহণ করেছেন, তেমনি হিন্দু পুরাণ, বিশেষত শাক্ত দর্শন এমনকি বৈদিক দর্শন, বৌদ্ধ মানবতাবাদ এবং পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। তার কাছে সত্য ও সৌন্দর্যের কোনো ধর্মীয় সীমানা ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে সংস্কৃতি মানুষকে বিভক্ত করে, তা নয়; বরং যে সংস্কৃতি মানুষকে একত্রিত করে, সেটিই মানবসভ্যতার প্রকৃত সম্পদ।

তার বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’ কেবল একটি রাজনৈতিক মতবাদের প্রচার নয়; এটি মানুষের সর্বজনীন মর্যাদার ঘোষণা। নজরুল সেখানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও শ্রেণিভেদকে অতিক্রম করে মানুষকে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল অন্যায়, শোষণ, উপনিবেশবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উচ্চারণ কোনো ব্যক্তি বা জাতির বিরুদ্ধে নয়; বরং সকল প্রকার অবিচার ও দাসত্বের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন মুক্তির আহ্বান। এই কারণেই তার বিদ্রোহ কালোত্তীর্ণ এবং সর্বজনীন।

ধর্ম সম্পর্কে নজরুলের অবস্থান ছিল গভীরভাবে আধ্যাত্মিক, কিন্তু কখনোই বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়। তিনি ধর্মকে বিভেদের নয়, মানবকল্যাণের শক্তি হিসেবে দেখেছেন। তার অসংখ্য ইসলামি গান যেমন মুসলিম সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভক্তিগীতিও বাংলা সংস্কৃতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই সৃজনশীল সমন্বয়ই তার বিশ্ববীক্ষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

নারীর প্রশ্নেও নজরুল ছিলেন অনন্য প্রগতিশীল। তিনি নারীকে করুণার নয়, সম্মান ও সমঅধিকারের আসনে দেখতে চেয়েছেন। তার ‘নারী’ কবিতা আজও নারী-পুরুষের সমমর্যাদার দাবিকে শক্তিশালী করে।

নজরুলের বিশ্ববীক্ষায় জাতীয়তাবাদও মানবতার অধীন। তিনি নিজের দেশকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু কখনো সংকীর্ণ জাতীয় অহংকারে বিশ্বাস করেননি। তার কাছে দেশপ্রেম মানে অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষ নয়; বরং নিজের জাতিকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তা বিশ্বমানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে চলমান যুদ্ধ, ধর্মীয় উগ্রবাদ, বিশেষত ভারত ও কৃত্রিম রাষ্ট্র ইসরাইলে যা উগ্রভাবে দৃশ্যমান, বর্ণবাদ, বিশেষত আমেরিকা, ইসরাইল, অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশে যা ক্রিয়াশীল, একই সাথে দুনিয়াব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রাণের কবি নজরুলের চিন্তা নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে। তার সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার স্থায়ী ভিত্তি শক্তির নয়, ন্যায়ের; ঘৃণার নয়, ভালোবাসার; বিভেদের নয়, মানবিক ঐক্যের।

দুর্ভাগ্য, আমরা অনেক সময় নজরুলকে কেবল বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি অথবা কেবল জাতীয় কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ তার সাহিত্য পাঠ করলে স্পষ্ট হয়, তিনি ছিলেন এক বিশ্বচিন্তার নির্মাতা। তার কাব্যে যেমন বাংলার মাটি কথা বলে, তেমনি প্রতিধ্বনিত হয় সমগ্র মানবজাতির আশা, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

অতএব নজরুলকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সময় এসেছে। তাকে কেবল আবৃত্তির মঞ্চে বা স্মরণ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তার বিশ্ববীক্ষাকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের আলোচনায় আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ নজরুলের বিশ্বদর্শন কেবল অতীতের সম্পদ নয়; এটি ভবিষ্যতেরও পথনির্দেশ।

মনে রাখতে হবে, বাংলার মাটি, জলবায়ু, পরিবেশ, প্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনবোধ ও সংস্কৃতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নানান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা আধিপত্য আমাদেরকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। এই শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। এই দেশ কখনো শেখতন্ত্র দ্বারা তাড়িত রাজতান্ত্রিক আরব হবে না তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মোড়কে হিন্দুত্ববাদীও হবে না। এদেশের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে। সুতরাং নজরুলই পারে আমাদের বর্তমান চলমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে। আসুন, আমরা নজরুলকে চর্চা করি এবং বোঝার চেষ্টা করি।
২৫ জুলাই ২০২৬

লেখক: সংগঠক, অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)