সম্পাদকীয়
অবসাদগ্রস্ত শৈশব, বিপন্ন ভবিষ্যৎ
শৈশব হওয়ার কথা আনন্দ, খেলাধুলা, কৌতূহল আর নতুন কিছু আবিষ্কারের সময়। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুল, কোচিং, হোমওয়ার্ক আর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে তাদের দিন কাটছে।
যে বয়সে একটি শিশুর মাঠে দৌড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা, পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার কথা, সে বয়সেই তাকে বই-খাতার ভারে ক্লান্ত করে তোলা হচ্ছে। সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে যশোরের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদি হাসানের দৈনন্দিন রুটিন এ সংকটের নির্মম উদাহরণ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়াশোনা, মাঝখানে পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ নেই। বিদ্যালয়ের শিক্ষকও স্বীকার করেছেন, দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনায় শিশুরা ক্লান্ত ও অমনোযোগী হয়ে পড়ে। ক্ষুধা, অবসাদ, খেলাধুলার অভাব এবং পর্যাপ্ত ঘুমের সংকট তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—শিশুকে এত বেশি সময় পড়িয়ে আমরা আসলে কী অর্জন করছি?
প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল বইয়ের পাঠ মুখস্থ করানো নয়। এই বয়সে শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও সৃজনশীল বিকাশ সমান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাস্তবে শিক্ষার সাফল্যকে অনেক সময় পরীক্ষার ফল, নম্বর ও পাঠ্যবই শেষ করার সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিংনির্ভরতা। বিদ্যালয়ের আগে ও পরে কোচিংয়ের চাপ শিশুর স্বাভাবিক সময়কেও গ্রাস করছে। ফলে শিক্ষাই হয়ে উঠছে ক্লান্তির আরেক নাম।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই চাপ শিশুদের স্বপ্নকেও সংকুচিত করছে। প্রতিবেদনে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন হোসেন রায়হানের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের কথা এসেছে। বিদ্যালয়ের দীর্ঘ সময়ের কারণে নিয়মিত ফুটবল অনুশীলনে যেতে না পারা তার মতো বহু শিশুর বাস্তবতা। অথচ খেলাধুলা কোনো বিলাসিতা নয়; শিশুর সুস্থ বিকাশের অপরিহার্য অংশ। একটি শিশু একই সঙ্গে ভালো শিক্ষার্থী এবং ভালো ক্রীড়াবিদ, শিল্পী কিংবা সৃজনশীল মানুষ হতে পারে—শিক্ষাব্যবস্থার কাজ সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।
যশোরে এক হাজার ২৮৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৭১টি দুই শিফটে পরিচালিত হওয়ার তথ্যও সমস্যাটির কাঠামোগত দিকটি স্পষ্ট করে। শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে যে শিফটভিত্তিক ব্যবস্থা চলছে, তা হয়তো একসময় প্রয়োজনীয় সমাধান ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। স্থানীয় বাস্তবতা, আবহাওয়া, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জীবনযাপন এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বিবেচনায় নিয়ে সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের সুযোগ থাকা উচিত।
একই সঙ্গে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও শারীরিক কর্মকাণ্ডকে শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত শিশুর কাছ থেকে মনোযোগী ও সৃজনশীল শিক্ষার্থী হওয়ার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত বিরতি, পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা, খেলাধুলার সুযোগ এবং বয়সোপযোগী পড়াশোনার চাপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু বই বাড়িয়ে শিক্ষার মান বাড়ে না; বরং কখনো কখনো তার উল্টো ফলও হতে পারে।
তাই এখন সময় এসেছে প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার। শিশুকে কত বেশি পড়ানো হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সে কত আনন্দ নিয়ে শিখলো, কতটা সুস্থভাবে বেড়ে উঠলো এবং নিজের প্রতিভা বিকাশের কতটা সুযোগ পেল। শিক্ষাব্যবস্থা যদি শিশুর শৈশবই কেড়ে নেয়, তবে ভবিষ্যতের জন্য আমরা কেমন নাগরিক তৈরি করছি—এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
শিশুকে শুধু বই নয়, বলও দিতে হবে; শুধু খাতা নয়, খেলাধুলার মাঠও দিতে হবে; শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অধিকারও দিতে হবে। কারণ আজকের শিশুর সুস্থ, আনন্দময় শৈশবই আগামী দিনের সুস্থ সমাজের ভিত্তি।