যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ফেঁসোর জীবন

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০১:০০ পিএম
ফেঁসোর জীবন

‘ফেঁসো’ শব্দটি অনেকের কাছেই অপরিচিত মনে হতে পারে। ফেঁসে যাওয়া থেকে ফেঁসো। পাট গাছ কেটে পানিতে জাগ দেওয়ার পর তা সম্পূর্ণরূপে পচলে কাণ্ড থেকে ছাল ছাড়ানো হয়। ওই ছালকে তখন বলা হয় পাট এবং ছালছাড়া সাদা কঙ্কালটিকে বলে পাটখড়ি।

আমরা খুব চিকন এবং লম্বা মানুষকে প্রায়ই পাটখড়ির সাথে তুলনা করি। এই যে পাট এবং পাঠখড়ির মধ্যে বিচ্ছেদ হলো, এই বিচ্ছেদের পূর্বে পাটের কিছু অংশ (খুব সরু তন্তু) পাটখড়ির গায়ে লেগে থাকে। অর্থাৎ ভিজে অবস্থায় পাটের যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তন্তুটি পাটখড়ির গায়ে ফেঁসে থাকে কিন্তু শুকনো অবস্থায় পাটখড়ির গায়ে আলগা হয়ে অবহেলিত অব্যবহৃত ঘরের ঝুলের মতো, মাকড়সার জালের মতো জড়িয়ে থাকে তাকে ফেঁসো বলে।

যারা পাটখড়ি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করে থাকবেন যে, পাটখড়িতে আগুন দিলে আগে ফেঁসো জ্বলে ওঠে। বিদ্যুৎগতিতে আগুন জ্বলে। অর্থাৎ পাঠখড়ি এমনেই দাহ্য পদার্থ, তাতে যদি ফেঁসো থাকে তাহলে দ্রুত বিষয়টি অতিদ্রুততে রূপান্তরিত হয়। এজন্য যারা পাটখড়ি সংরক্ষণ করে তারা হাত দিয়ে ছাড়িয়ে অথবা আগুনের আঁচে দিয়ে পাটখড়ির গায়ের ফেঁসো জ্বালিয়ে ফেঁসোমুক্ত করে রাখে। নইলে পাটখড়ির স্তূপে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে যায়।

ফেঁসো পাটের আঁশেরই কার্যত অপ্রয়োজনীয় অংশ। এটা আলাদা করে মূল্যায়িত হয় না। এটার একটা তুচ্ছ ব্যবহার আগে দেখা যেত। চুলায় রস জ্বালানোর সময় ব্যারেলের গায়ে যে ময়লা জড়াতো তা এই ফেঁসো দিয়ে পরিষ্কার করা হতো। অর্থাৎ ফেঁসো বিষয়টি যথেষ্ট তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বস্তু। আমরা মানুষেরাও কে কার জীবনে ফেঁসো হয়ে ফেঁসে আছি তা অনেকেই বুঝতে পারি না।

আমরা আবেগে কাকে বা কী ছেড়ে কার বা কীসের ফেঁসো হয়ে জড়িয়ে আছি ভিজে অবস্থায় আমরা তা অনুভব করতে পারি না। কিছুদিন গেলে সময়ে জীবন শুকিয়ে এলে হঠাৎ একদিন আমরা ফেঁসোর মলো আলগা হয়ে যাই। সেদিন আমরা বুঝতে পারি যে, আমরা না পাটের, না পাটখড়ির। অধিকাংশের জীবনেই এরকম ঘটনা ঘটে।

বিষয়টি ভাবলেই মানুষের মধ্যে কিছুটা হীনম্মন্যতা কাজ করে। না জানি কে কাকে তার জীবনে ফেঁসো ভেবে টুক করে জ্বালিয়ে দিতে চাইছে, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তার থেকে ছাড়িয়ে দিতে চাইছে। মনে মনে নিজেকে ফেঁসো ভাবতেই কেমন যেন আবেগপ্রবণ হয়ে যেতে হয়। ফেঁসোর ভাবনা এমন যে আমি পাটকে পাটখড়ির গায়ে আটকে রেখেছিলাম। পাটখড়ির মায়ায় পড়ে পাটের সঙ্গী হলাম না। পাটখড়ির দেহে আটকে রইলাম। কৃষকও আমাকে পাটখড়ি থেকে পৃথক করতে পারেনি। এখন শুকনো পাটখড়ি তার জীবনের নিরাপত্তা বিবেচনা করে আমার সঙ্গ আর সে চায় না। আমি শ্যাম-কূল দুই হারিয়ে ফেঁসোর জীবন নিয়ে ফেঁসে রইলাম। জীবনে এর থেকে হতাশা আর কী হতে পারে?

আমরা যারা ফেঁসো হয়ে অন্যের জীবনে অথবা শুধু একটি লক্ষ্যে হাঁসফাঁস করছি, মরিমরি করে আধমরার মতো বেঁচে আছি, তাদের চোখে দুর্গা বা অসুর পড়ে না। কারণ আমরা পাটখড়িকে (একজন মানুষ অথবা একটি লক্ষ্য) ভালোবেসে মরে যেতে চাই। এটা আমাদের আবেগ। পাটখড়ি আমাদের আরাধানার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আবেগে অন্ধ হয়ে থাকি। অথচ এই তুচ্ছ জীবন নিয়েও কিছু ফেঁসো শরতে দুর্গার চুল হয়, অসুরের গোঁফ হয়। নিজেকে ফেঁসো হিসেবে আবিষ্কারের পরেই যদি এই ভাবনাটা কাজ করতো! তাহলে ফেঁসো হয়েও মানুষের পৃথক জীবন ভাবনার ফুসরত মিলতো। হতাশায় আত্মহত্যার প্রয়োজন হতো না।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)