আল আমিন মুক্ত
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। একটি রোগমুক্ত, কর্মক্ষম এবং সচেতন আগামী প্রজন্ম গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত ও প্রাথমিক ভিত্তিভূমি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিটি শিশুর সুস্থতার খবর রাখা এবং প্রাথমিক বয়স থেকেই তাদের সঠিক যত্ন নেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতির বীজ বপন করা সম্ভব।
এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি সুসংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্থায়ী ‘স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম’ বা স্কুল স্বাস্থ্য কার্যক্রম চালু করা এখন সময়ের দাবি। একটি কার্যকর স্কুল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হতে পারে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি একটি নির্দিষ্ট ‘স্কুল হেলথ কার্ড’। যেখানে শিশুর একদম ছোট বয়স থেকে বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে। শিশুর উচ্চতা, ওজন, দৃষ্টিশক্তি, পুষ্টির মান, রক্তস্বল্পতা বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে এই কার্ডে নথিভুক্ত করা হবে। এর ফলে যেকোনো শিশু স্বাস্থ্যের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে কি না, তা খুব সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
তবে এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত একটি সমন্বিত ডেটাবেজ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। মাঠপর্যায়ে এই কাঠামোকে সফল করতে একটি বহুমাত্রিক দলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক এই পুরো কার্যক্রমের প্রশাসনিক তদারকি করবেন এবং সাধারণ শিক্ষকরা এতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবেন। তবে এই প্রক্রিয়ার মূল সঞ্চালক হিসেবে কাজ করবেন বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক বা এই বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষক, যিনি তার অ্যাকাডেমিক জীবনে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্কুল স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। একই সাথে স্থানীয় ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসারদের এই কাঠামোর সাথে সরাসরি যুক্ত করতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা যায়।
বিদ্যালয়, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তির এই যৌথ সমন্বয় যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে জাতীয় পর্যায়ে এর সুদূরপ্রসারী সুফল পাওয়া যাবে। প্রথমত, ছোটবেলা থেকেই শিশুরা নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে শিখবে এবং নিজেদের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পারবে। কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে একদম প্রাথমিক পর্যায় পর্বেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে, যা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিশুর এই স্বাস্থ্যগত তথ্য সরকারের কাছে সংরক্ষিত থাকলে তা দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি অমূল্য সম্পদে পরিণত হবে। দেশের কোন অঞ্চলের শিশুরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে বা কোন বিশেষ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্ট ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে উদঘাটন করা যাবে। এই গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক নীতি নির্ধারণ করতে পারবে।
সর্বোপরি, শৈশবেই যদি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায় এবং সঠিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগের বিস্তার অনেকটাই কমে আসবে। এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের ওপর, যার ফলে চিকিৎসাসেবার পেছনে সরকারের যে বিপুল অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়, তা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। তাই স্কুল হেলথ প্রোগ্রামকে কেবল একটি সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ হিসেবে না দেখে, একটি সুস্থ, সচেতন ও সবল বাংলাদেশ গড়ার কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। দেশের সর্বস্তরে সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে এই কার্যক্রম চালু করতে নীতি নির্ধারকদের অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
লেখক: শিক্ষার্থী (স্নাতকোত্তর), শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়