যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মানবজীবনে সাহিত্য: প্রয়োজন প্রভাব ও তাৎপর্য

বেনজীন খান

প্রকাশ : বুধবার, ১৪ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
মানবজীবনে সাহিত্য: প্রয়োজন প্রভাব ও তাৎপর্য

বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন লেখিয়েদের মধ্যে একটা প্রবণতা ভীষণভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে—তারা সাহিত্য বলতে কেবল পদ্য লেখাকে বুঝছে। মনে যা আসছে, সেটাকেই মিলতাল করে উপস্থাপনকে মনে করছে সাহিত্য। আসলেই ব্যাপারটা কি এমন?

আজ আমরা সাহিত্যের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এবং মানবজীবনে এর প্রয়োজন, প্রভাব ও তাৎপর্য বিষয়ে আলোচনা করবো।

‘সাহিত্য’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত স-হি-ত (sahita) শব্দ থেকে। ‘সহিত’ অর্থ—সঙ্গে বা মিলিত। সেই অর্থে সাহিত্য মানুষের সঙ্গে মানুষের, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের এবং জীবনের সঙ্গে জীবনের এক গভীর সংযোগের নাম।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের অর্থ নিয়ে তাঁর ভাবনায় বোঝাতে চেয়েছেন—সাহিত্য কেবল তথ্য বা জ্ঞান পরিবেশন করে না; মানুষের অন্তরের অনুভূতি, কল্পনা, সৌন্দর্যবোধ ও জীবন-অভিজ্ঞতাকে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ সাহিত্য মানুষের বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করে হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন করে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ভাবনা ছিল—সাহিত্য মানুষের জীবন, অনুভূতি, চিন্তা, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সৃজনশীল প্রকাশ; আর সেই সাহিত্য মানুষের মধ্যে সাম্য, স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও সত্যের চেতনা জাগাবে।

নিভৃতির অন্তর্মুখী কবি জীবনানন্দ দাশ বলছেন—‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি।’ তাঁর মতে, শুধু অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি থাকলেই সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। কবির মধ্যে এমন এক বিশেষ সৃজনশীল চেতনা ও কল্পনাশক্তি থাকতে হয়, যা সাধারণ জীবন-অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপ দিতে পারে।

আবার বিশ্ব কথাসাহিত্যের নবী লিও টলস্টয়ের কাছে সাহিত্য হলো—সত্য ও মানবিক অনুভূতির এমন এক শিল্পরূপ, যা মানুষকে অন্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে এবং তার নৈতিক ও আত্মিক চেতনাকে জাগিয়ে তোলে।

অতএব, সাহিত্য কেবল পদ্য নয়, এমনকি সাহিত্য শুধু কবিতা-গল্প-উপন্যাসের সমষ্টিও নয়; সাহিত্যকে দেখা উচিত মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, নৈতিকতা, ইতিহাস, সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের একটি শক্তি হিসেবে।

সাহিত্য শুধু সুন্দর ভাষায় লেখা কোনো রচনা নয়। সাহিত্য—মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, চিন্তা, কল্পনা, স্বপ্ন, সংকট ও সমাজবাস্তবতার সৃজনশীল প্রকাশ। অর্থাৎ, সাহিত্য একদিকে জীবনের প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে জীবনকে দেখার একটা নতুন চোখ।

আমরা সাহিত্যের আঁতুড়ঘর খুঁজতে বের হলে দেখতে পাবো, লিখিত সভ্যতার বহু আগে থেকেই মানুষ তার অভিজ্ঞতা গল্প, গান, মিথ, উপকথা ও কবিতার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে এসেছে। কারণ মানুষ শুধু বেঁচে থাকতে চায় না, সে তার অভিজ্ঞতাকে অর্থ দিতে চায়, স্মৃতি সংরক্ষণ করতে চায় এবং নিজের অস্তিত্বকে প্রকাশ করতে চায়। সাহিত্য তাই মানবসভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডারও বটে।

মানবজীবনে সাহিত্যের প্রয়োজন তাই অপরিসীম। এই প্রয়োজন আমরা কয়েকটি স্তরে বুঝে নিতে পারি—

মানসিক প্রয়োজন

সাহিত্য মানুষের জীবনের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব ও অস্তিত্বের সংকটকে ভাষা দেয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন

সাহিত্য মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করতে শেখায়।

নৈতিক প্রয়োজন

মানুষের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, দায়িত্ব ও মানবিকতার প্রশ্ন সামনে আনে।

সামাজিক প্রয়োজন

অন্য মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা বুঝতে সাহায্য করে।

ঐতিহাসিক প্রয়োজন

সাহিত্য মানুষ ও সমাজের যুগ যুগান্তরের চিন্তা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে।

নান্দনিক প্রয়োজন

সাহিত্য মানুষের সৌন্দর্য উপলব্ধির ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

আত্মপরিচয়ের প্রয়োজন

সাহিত্য ব্যক্তি ও জাতিকে নিজের পরিচয় বুঝতে সাহায্য করে।

সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, অনুভব করায়।

যেমন, ইতিহাসের বই থেকে আমরা জানতে পারি, একটি যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। এটা একটা তথ্য। কিন্তু একটা ভালো উপন্যাস বা গল্প সেই যুদ্ধে একজন মায়ের চোখের জল, একজন সৈনিকের ভয় কিংবা একটা শিশুর পিতৃহীন হয়ে যাওয়ার বেদনা আমাদের অনুভব করায়।

এখানেই তথ্য ও সাহিত্যের পার্থক্য।

তথ্য জানায়, সাহিত্য অনুভব করায়।

তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায়, সাহিত্য আমাদের মস্তিষ্কের পাশাপাশি হৃদয়েও পৌঁছায়।

একজন মানুষ নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বাইরে খুব বেশি কিছু সরাসরি অনুভব করতে পারে না। কিন্তু সাহিত্য তাকে অন্য মানুষের জীবন কল্পনার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়।

একজন রাজা, একজন ভিখারি, একজন কৃষক, একজন বন্দী, একজন নারী, একজন পরাজিত মানুষ কিংবা একজন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ—সাহিত্য আমাদের তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে শেখায়।

এই কারণেই সাহিত্য মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহানুভূতি তৈরি করতে পারে।

সাহিত্য শুধু সমাজের ছবি আঁকে না; অনেক সময় সমাজকে প্রশ্নও করে।

দাসপ্রথা, নারীর অধিকারহীনতা, শ্রেণিবৈষম্য, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, ঔপনিবেশিক শোষণ, যুদ্ধ, নিপীড়ন—বিভিন্ন যুগে সাহিত্য এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করেছে। অর্থাৎ, সাহিত্য সমাজের আয়না, আবার সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ারও।

সাহিত্য মানুষের চিত্তকে স্বাধীন করে। সুস্থ সাহিত্য মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শেখায় না; বরং প্রশ্ন করতে শেখায়।

কেন?

এটা কি সত্য?

এটাই কি একমাত্র সত্য?

অন্য মানুষের চোখে বিষয়টি কেমন?

এই প্রশ্নগুলো থেকেই সমালোচনামূলক চিন্তার জন্ম হয়। তাই যে সমাজে ভালো সাহিত্যচর্চা হয়, সেখানে চিন্তার বৈচিত্র্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
সাহিত্য সরাসরি ইতিহাস নয়, তবে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্নও নয়। ইতিহাস আমাদের বলে কী ঘটেছিল; সাহিত্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করে মানুষ সেই ঘটনাকে কীভাবে অনুভব করেছিল।

বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালে সৈয়দ সুলতান, আলাওল, আব্দুল হাকিম, মধুসূদন, বঙ্কিম, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক, জীবনানন্দ, জসীম, ফররুখ প্রমুখের রচনার মধ্য দিয়ে আমরা শুধু সাহিত্য নয়, তাঁদের সময়ের সমাজ, মানুষ, অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রেম, দারিদ্র্য ও মানসিকতারও পরিচয় পাই।

তাই সাহিত্য ইতিহাসের বিকল্প নয়, কিন্তু ইতিহাসকে মানবিকভাবে বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ভাষা ও সাহিত্য একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, নজরুলের বিদ্রোহ ও মানবতাবাদ, মাইকেল মধুসূদনের নবজাগরণী চেতনা—সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্য একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তৈরি করেছে।

আজ বিজ্ঞানের এই চরমতম বিকাশের যুগে, পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে যত বেশি সংযুক্ত হয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে মানসিকভাবে তত বেশি একাকীও হয়েছে। একাকিত্বের এই কঠিনতম নির্বাসনে সাহিত্যই একজন মানুষের নীরব সঙ্গী হতে পারে।

একটা কবিতা কখনো এমন একটা অনুভূতির ভাষা দিতে পারে, যা মানুষ নিজে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না।

সাহিত্য আমাদের কানে কানে বলে, তুমি একা নও; তোমার এই অনুভূতি অন্য কেউও অনুভব করেছে।

অনেকে অবশ্য ‘‘Art for ArtÕs Sake’’-এ বিশ্বাসী। তারা বলতে চায়, ‘শিল্প শিল্পের জন্য’ বা ‘শিল্পের জন্যই শিল্প’। অর্থাৎ শিল্পের প্রধান উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি ও নান্দনিক আনন্দ দেওয়া।

কিন্তু সাহিত্য নিয়ে আরেকটি শক্তিশালী মত হলো, শিল্পের সামাজিক ও মানবিক দায়ও রয়েছে।

সাহিত্য আনন্দ দেয়, কিন্তু শুধু বিনোদন দেওয়া তার একমাত্র কাজ নয়। সাহিত্য কখনো আনন্দ দেয়, কখনো অস্বস্তিতে ফেলে; কখনো প্রশ্ন তোলে, কখনো প্রচলিত বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়; কখনো আমাদের কাঁদায়, কখনো লজ্জিত করে, কখনো প্রতিবাদী করে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আমরা মনে রাখতে পারি—

যে সাহিত্য শুধু বিনোদন দেয়, তা আমাদের সময় কাটাতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু যে সাহিত্য আমাদের চিন্তাকে পরিবর্তন করে, তা আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে।

আজকে তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের সামনে তথ্যের অভাব নেই। কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর যেকোনো বিষয়ে হাজার হাজার তথ্য পাওয়া যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, তথ্যের বিপুলতা কি মানুষকে জ্ঞানী করে তুলেছে?

অবশ্যই সবসময় না।

তথ্য মানুষকে অনেক কিছু জানায়; কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ বোঝা, বিচার করা এবং জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপন করা ভিন্ন বিষয়। এখানেই সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাহিত্য মানুষের কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণক্ষমতা, ভাষাবোধ, অনুভূতি ও মানবিক বিচারবোধ বিকশিত করে।

বর্তমান দুনিয়া আজ প্রবেশ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে। মানুষ তাই আহ্লাদে গদগদ। এআই-ও বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, লেখা তৈরি করতে পারে, অনুবাদ করতে পারে। যেন মানুষের আর প্রয়োজন নেই।

কিন্তু মানুষের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার মূল প্রশ্নটি অন্যখানে—

মানুষের আত্মার প্রশ্ন, মানুষ কেন সৃষ্টি করে? কেন ভালোবাসে? কেন কাঁদে? কেন মৃত্যুকে ভয় পায়? কেন ভয় পেয়ে প্রতিবাদ করে না? আবার একই মানুষ কেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়? কেন মুগ্ধরা যুদ্ধ করে? কেন আবু সাঈদ দু’হাত উঁচু করে বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দেয়?

সাহিত্য এই মানবিক প্রশ্নগুলোর সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি করে।

তাই প্রযুক্তি যতই উন্নত হবে, মানুষের মানবিক আত্মপরিচয় বোঝার জন্য সাহিত্য ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পরিশেষে বলবো, সাহিত্য কি জীবনকে অনুসরণ করে, নাকি নির্মাণ করে?

উত্তর—দুটাই।

জীবন সাহিত্যকে উপাদান দেয়; আবার সাহিত্য মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে বাস্তব জীবনকেও পরিবর্তন করে।

একটা কবিতা একটা আন্দোলনের ভাষা বা স্লোগান হতে পারে।

একটা উপন্যাস একটা সমাজের বিবেককে নাড়া দিতে পারে।

একটা নাটক একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করাতে পারে।

একটা গান একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

মূল কথা হলো, মানুষের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে যেমন খাদ্য, তেমনি মানুষের মনুষ্যত্বকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন সংস্কৃতি, দর্শন, শিল্প ও সাহিত্য।

সাহিত্য তাই শুধুই নাম কামানো, প্রতিষ্ঠিত হওয়া, পুরস্কার হাতিয়ে নেওয়ার চতুর বিলাসিতা নয়; এটা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক, নান্দনিক ও মানবিক বিকাশের প্রয়োজনীয় উপাদান।

এক কথায়, সাহিত্য মানুষের জীবনকে শুধু বর্ণনা করে না; সাহিত্য মানুষকে নিজের জীবনকে নতুন করে দেখতে শেখায়।

০২ অক্টোবর ২০২৬

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও সংগঠক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)