সম্পাদকীয়
একটি দেশ কতটা শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে দেশটির নতুন প্রজন্ম কতটা মেধাবী, দক্ষ, সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠছে তার ওপর। আজকের শিশু-কিশোররাই আগামীতে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চিত করা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭’ (সিজন-২) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এই বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে।
খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শিশু-কিশোরদের পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং বিদেশি ভাষা শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ অর্জন করলেই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুমুখী জ্ঞান, সৃজনশীলতা, শারীরিক সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক চেতনা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দক্ষতা। আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতায় এ উপলব্ধি অত্যন্ত সময়োপযোগী।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসরে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন শিশু-কিশোরের নিবন্ধন নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এটি প্রমাণ করে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র খেলাধুলার প্রতি শিশুদের আগ্রহ ও প্রতিভা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেই প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা। দেশের ৫০৩টি উপজেলায় এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। নতুন করে ভলিবল ও টেবিল টেনিস যুক্ত হওয়ায় প্রতিযোগিতার পরিসরও বেড়েছে।
তবে এ ধরনের আয়োজনের সাফল্য কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, বিপুলসংখ্যক নিবন্ধন কিংবা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিযোগিতা শেষে প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের কতজনকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত ক্রীড়া সরঞ্জাম, পুষ্টি, চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে তার ওপর। প্রত্যেক উপজেলায় খেলার মাঠ, প্রশিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ, দরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী শিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রতিভা যেন আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একইভাবে খেলাধুলার পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন প্রয়োজন। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির উদ্যোগও ইতিবাচক। তবে ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রয়োজন বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে মাতৃভাষা বাংলার শুদ্ধ চর্চা ও মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অপরিহার্য। শুধু পরীক্ষার ফলাফল কিংবা ভালো চাকরিকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করলে শিশুদের স্বাভাবিক প্রতিভা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চাকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে তাদের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, শিশুরাই বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর এবং এই দেশের মালিক। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের দায়িত্ব আজকের শিশু-কিশোরদের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের উপযুক্তভাবে গড়ে তোলার দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। সে দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতিগত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত বাজেট, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
আমরা চাই, ‘নতুন কুঁড়ি’ কেবল একটি মৌসুমি প্রতিযোগিতা হয়ে না থাকুক; বরং এটি হয়ে উঠুক মেধা ও প্রতিভা বিকাশের একটি স্থায়ী জাতীয় প্ল্যাটফর্ম। প্রতিটি শিশুর প্রতিভা বিকাশের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনে বাংলাদেশ শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি ও বিশ্ব নেতৃত্বেও নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবে। আজকের শিশুদের জন্য বিনিয়োগই হবে আগামীর শক্তিশালী, আত্মমর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি।