এম এ মেহমুদ সাগর
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ছাড়া দেশের শেয়ারবাজারে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব। তাই এই খাতের বিকাশে কার্যকর ও বৈপ্লবিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। শুধু ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দৈনন্দিন লেনদেনের ওপর নির্ভর করে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। এই জায়গাতেই মিউচুয়াল ফান্ড খাত সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
পুঁজিবাজারের আধুনিকায়নে বিগত কমিশনগুলো বিভিন্ন সময়ে নানা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও মিউচুয়াল ফান্ড খাতের প্রকৃত উন্নয়নে তেমন কোনো দূরদর্শী ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে বাজার এখনো তার নির্দিষ্ট গভীরতা ও লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই খাতের আমূল পরিবর্তনে অংশীজনদের সাথে নিয়ে ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫’ পর্যালোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের যুগোপযোগী সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সাম্প্রতিক বক্তব্যও এটি স্পষ্ট করে যে, বাজারের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী মিউচুয়াল ফান্ড খাত গড়ে তোলা অপরিহার্য।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের অবদান বা মোট সম্পদ জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশের কাছাকাছি, যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের (প্রায় ১৭%) তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। অতীতে বেশিরভাগ ক্লোজড-এন্ড (মেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ড বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রকৃত সম্পদের মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বা ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়েছিলেন। তবে বর্তমান কমিশনের তরফ থেকে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডগুলোকে ওপেন-এন্ড (মেয়াদহীন) ফান্ডে রূপান্তরের সুস্পষ্ট ও সহজ নির্দেশিকা প্রণয়নের ফলে বাজারে এই খাতের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি আয়কর আইন অনুযায়ী মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত এবং লভ্যাংশ আয়ের ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধার মতো বিষয়গুলোকেও প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রীক বিনিয়োগ বাড়াতে আরও সহজ করা প্রয়োজন।
শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির পাশাপাশি ‘আর্থিক সাক্ষরতা’ বা বিনিয়োগ শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আর্থিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং সঠিক বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা না বাড়ালে বাজারের টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়। গুজব বা আবেগের বশে বিনিয়োগ করে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ফান্ড ম্যানেজারদের যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী ব্যাপক আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। একটি সুশৃঙ্খল ও গতিশীল পুঁজিবাজার বিনির্মাণে শক্তিশালী মিউচুয়াল ফান্ড এবং শিক্ষিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীই হবে আগামী দিনের মূল ভিত্তি।
লেখক: পুঁজিবাজার ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষক