যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

শূন্য পাস: সংকট অনেক, সমাধান করুন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে

প্রকাশ : রবিবার, ৮ নভেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
শূন্য পাস: সংকট অনেক, সমাধান করুন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু একটি ভবন কিংবা কয়েকটি শ্রেণিকক্ষের সমষ্টি নয়; এটি একটি এলাকার স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র। অথচ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের সবুজ পল্লী কলেজের চিত্র আমাদের সেই প্রত্যাশার বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ধানখেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষকশূন্য শ্রেণিকক্ষ, বেতনবঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারী এবং পরীক্ষার্থীদের ভয়াবহ বিপর্যয়কর—সব মিলিয়ে কলেজটি যেন গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার অবহেলা ও বৈষম্যের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সুবর্ণভূমির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৩ সালে স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ একসময় এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের আশ্রয়স্থল ছিল। মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য—তিনটি বিভাগে পাঠদানের অনুমোদন নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে একসময় ১৫ জন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় শিক্ষকরা একে একে চলে গেছেন। বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের পাঠদান কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বশেষ ইংরেজির একমাত্র প্রভাষক এস আলমের মৃত্যুর পর সেই শূন্যতা আরও প্রকট হয়েছে। একজন শিক্ষকের মৃত্যুর পর ওই পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সামর্থ্য কিংবা নিশ্চয়তা—কোনোটিই প্রতিষ্ঠানের নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

পরীক্ষার ফলাফলও সেই সংকটের নির্মম সাক্ষ্য দিচ্ছে। ২০২২ সালে ৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২৭ জনের মধ্যে ২৬ জন এবং ২০২৪ সালে দশজনের মধ্যে আটজন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ২০২৫ সালে পাঁচজনের মধ্যে পাস করেন তিনজন। আর সর্বশেষ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সাতজন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি।

কলেজটির শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে কোনো বেতন-ভাতা পাননি। একজন শিক্ষক সংসার চালাবেন কীভাবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন কীভাবে, যদি তার পেশাগত জীবনের কোনো আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকে? কেবল শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকিয়ে বছরের পর বছর বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষকতা করার প্রত্যাশা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষকদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

কলেজটির এমপিওভুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের যে অভিযোগ উঠেছে, তা-ও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই এলাকায় পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত আরেকটি কলেজ দ্রুত এমপিওভুক্ত হলেও পুরোনো প্রতিষ্ঠানটি কেন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা দরকার। এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব নয়, বরং নির্ধারিত নীতিমালাই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একটি কলেজের প্রতি অবিচার নয়, শিক্ষার সুযোগের সমতার নীতিরও পরিপন্থি।

তবে শুধু এমপিওভুক্তিই শিক্ষা উন্নয়নের একমাত্র পথ নয়। শিক্ষাবোর্ডের স্বীকৃতি নবায়ন, শিক্ষার মান এবং পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগও অমূলক নয়। শূন্য পাসের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেখতে হবে, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী কে বা কারা। শিক্ষক নেই, নিয়মিত পাঠদান নেই, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নেই—এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপানো মোটেই ন্যায়ঙ্গত নয়। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে সমস্যার সমাধান হবে না।

আমরা মনে করি, সবুজ পল্লী কলেজের সংকট নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং যশোর শিক্ষা বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, কলেজটির প্রতিষ্ঠাকালীন নথি, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী উপস্থিতি, পাঠদানের পরিবেশ ও এমপিওভুক্তির যোগ্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অন্তত ইংরেজিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জরুরি ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কলেজটির অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকদেরও এ উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে হবে।

একটি কলেজের ব্যর্থতা মানে একটি এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্বপ্নের অপমৃত্যু। সবুজ পল্লী কলেজকে কেবল শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে দায় শেষ করা যাবে না। বরং কেন প্রতিষ্ঠানটি এই পরিণতিতে পৌঁছালো, কারা এর জন্য দায়ী এবং কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব—সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)