এম জুবায়ের মাহমুদ
একজন সংবাদকর্মীর চোখে সংবাদ, মানুষের কথা ও দায়িত্ববোধ, সাংবাদিকতা আমার কাছে কখনোই শুধু একটি পেশা নয়। এটি মানুষের কথা বলার দায়িত্ব, সত্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা এবং সমাজের নানা অসঙ্গতি, সম্ভাবনা ও বাস্তবতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।
সাংবাদিকতার পথচলায় আমার ছয় বছর পেরিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। মাঠে ঘুরেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, ঘটনার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, তথ্য যাচাই করেছি এবং সংবাদ লিখেছি। এই সময়ে আমার লেখা লিড হয়েছে, একাধিক সংবাদ সেকেন্ড লিড হয়েছে এবং অসংখ্য সংবাদ পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিটি প্রকাশিত সংবাদই আমার কাছে একেকটি অভিজ্ঞতা। কোনোটি আনন্দ দিয়েছে, কোনোটি নতুন কিছু শিখিয়েছে, আবার কোনোটি মনে করিয়ে দিয়েছে, একজন সংবাদকর্মীর কলমের প্রতিটি শব্দের সঙ্গে দায়িত্ব জড়িয়ে থাকে।
সুবর্ণভূমির সঙ্গে পাঁচ মাস
এই ছয় বছরের সাংবাদিকতা জীবনের পথচলায় গত পাঁচ মাস ধরে যুক্ত আছি সুবর্ণভূমির সঙ্গে, শ্যামনগর উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সুবর্ণভূমির সঙ্গে তৈরি হয়েছে আমার এক বিশেষ সম্পর্ক।
শ্যামনগর থেকে পাঠানো আমার সংবাদ লিড হয়েছে, একাধিক সংবাদ সেকেন্ড লিড হয়েছে এবং অসংখ্য সংবাদ পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। নিজের পাঠানো একটি সংবাদ যখন পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অথবা লিড হিসেবে দেখি, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভালো লাগে। কিন্তু সেই ভালো লাগার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে দায়িত্ববোধ।
সুবর্ণভূমিতে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, একটি সংবাদ প্রকাশিত হওয়া কোনো কাজের শেষ নয়; বরং আরও ভালো, আরও নির্ভুল ও আরও দায়িত্বশীল সংবাদ করার নতুন শুরু।
ছয় বছরের সাংবাদিকতা আমাকে মাঠের অনেক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। শিখিয়েছে সব সংবাদ চোখে পড়ে না। কিছু সংবাদ খুঁজে নিতে হয়, কিছু তথ্য বারবার যাচাই করতে হয়, আবার কোনো কোনো ঘটনার গভীরে যেতে হলে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়।
নদী, সুন্দরবন, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, দুর্যোগ, জনদুর্ভোগ কিংবা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রতিটি বিষয়ের মধ্যেই সংবাদ আছে। কিন্তু একজন সংবাদকর্মীর কাজ শুধু ঘটনাস্থলে গিয়ে ‘কী ঘটেছে’ লেখা নয়। কখনো জানতে হয় কেন ঘটেছে? কখনো খুঁজতে হয় এর পেছনে কারা বা কী কারণ রয়েছে? আবার কখনো জানতে হয় এই ঘটনার প্রভাব পড়ছে কার ওপর?
আর সেখান থেকেই একটি সাধারণ খবর হয়ে উঠতে পারে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় একটি প্রতিবেদন।
একটি প্রতিবেদন যদি কোনো মানুষের কষ্টের কথা সামনে আনে, কোনো অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কোনো অবহেলিত বিষয়কে আলোচনায় নিয়ে আসে কিংবা মানুষের অধিকার ও সমস্যার কথা তুলে ধরে তাহলে সেটিই একজন সংবাদকর্মীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সাংবাদিকতা জীবনে প্রতিবারই মনে হয়েছে আরও ভালো করতে হবে, আরও নির্ভুল হতে হবে। আরও গভীরে যেতে হবে, আরও বেশি মানুষের কথা বলতে হবে।
যেতে হবে বহুদূর
একটি গণমাধ্যমের বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের বছর দিয়ে মাপা যায় না। তার প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় পাঠকের আস্থা, সংবাদ প্রকাশের দায়িত্বশীলতা এবং মানুষের কথা বলার সাহসের মধ্য দিয়ে।
প্রতিষ্ঠার প্রথম বছর পেরিয়ে সুবর্ণভূমি নতুন বছরে পা রেখেছে। সামনে আরও অনেক পথ। সেই পথে আরও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার গল্প উঠে আসুক—এটাই প্রত্যাশা।
সংবাদ হয়তো একদিনের, কিন্তু একজন সংবাদকর্মীর দায়িত্ব দীর্ঘদিনের।
সামনে আরও অনেক পথ। আরও অনেক সংবাদ। আরও অনেক মানুষের গল্প। সেই পথেই থাকতে চাই সত্যের সাথে, মানুষের পাশে এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধের জায়গায়।
সুবর্ণভূমির পথচলা হোক আরও দীর্ঘ, আরও সমৃদ্ধ হোক।
লেখক: সংবাদকর্মী, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)