সম্পাদকীয়
হাসনাত আব্দুল্লাহ এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে নতুন নেতৃত্ব সামনে এসেছে তিনি তাদের মধ্যে একজন।
গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকা তরুণরা পরে এনসিপি নামে যে দলটি গঠন করে তারা এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের হয়ে আসন ভাগাভাগি করে একসাথে নির্বাচন করছে।
হাসনাত শনিবার যশোরে তাদের জোটের পক্ষে এক নির্বাচনি পথসভায় বক্তৃতাকালে ‘বুকে ধানের শীষ লাগিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন দাঁড়িপাল্লায়’ বলে জনগণকে পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ‘গুপ্ত’ শব্দটি বহুল আলোচিত। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে বিরোধীদলগুলো চরম নিষ্পেষণের শিকার হয়। তখন জামায়াত নেতাকর্মীরা ছদ্মবেশে বিভিন্ন দল, বিশেষ করে শাসক আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ে। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সাথে একাকার হয়ে তারা নানা অপরাধমূলক কাজে জড়ায় বলেও অভিযোগ আছে। গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা বিতাড়িত হওয়ার পর সেই জামায়াত-শিবির নিজস্ব পরিচয়ে ফিরে এসেছে। সেই কারণে জামায়াত-শিবিরকে অনেকে ‘গুপ্ত’ বলে পরিহাস করছে।
এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সব দল নির্বিঘ্নে ভোটের প্রচার চালাচ্ছে। এই অনুকূল সময়ে কেন ছদ্মবেশ ধরতে হবে, সে প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ এই প্রশ্নও তুলছেন যে, হাসনাত আব্দুল্লাহও কি আসলে জামায়াত-শিবিরই ছিলেন গুপ্তবেশে? পুরনো অভ্যাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েই কি তিনি এসব কথা বলছেন?
সময়ের প্রয়োজনে নিজের পরিচয় লুকানো তথা গুপ্ত অবস্থায় থাকা লাগতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে সেই গুপ্ত রাজনীতির চর্চা বা সেই দিকে মানুষকে ঠেলে দেওয়া নৈতিকতাপরিপন্থি। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অস্বচ্ছ ও অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়।
গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে বাংলাদেশে নতুন নেতৃত্বের উত্থান হয়েছিল। কিন্তু সেই নেতৃত্ব যখন পুরনো ধারার রাজনীতিতে একাকার হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সংশয় তৈরি হয়। হাসনাত আব্দুল্লাহর বর্তমান অবস্থান এবং জামায়াতের সাথে তার দল এনসিপির জোটÑএটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে আমাদের রাজনীতিতে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্পষ্টতা’র চর্চা এখনও রয়ে গেছে।
গণতান্ত্রিক মানসিকতা হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিজ দলের নীতির পরিচয়ে রাজনীতি চর্চা। মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ভিন্ন দলের প্রতীক ব্যবহার, নিজেকে অস্পষ্ট রাখা বা গুপ্ত অবস্থান গ্রহণ করাÑএগুলো মুক্ত পরিবেশে বেমানান। বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট, নীতিনিষ্ঠ ও নৈতিক অবস্থান গ্রহণ কাম্য।
হাসনাত আব্দুল্লাহ ও তার সহযোদ্ধাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা গণঅভ্যুত্থানের আদর্শিক চেতনাকে ধারণ করে স্বচ্ছ ও নৈতিক রাজনীতির উদাহরণ স্থাপন করা। নতুন প্রজন্মের কাছে তারা যদি ‘গুপ্তবেশী রাজনীতির’ উত্তরাধিকার বহন করেন, তবে তা হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। বাংলাদেশের মানুষ এখন স্বচ্ছ, নীতিবাদী রাজনীতি চায়। যে নেতারা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিলেন, তাদের উচিত এই প্রত্যাশা পূরণে নৈতিক দায়িত্বশীলতা দেখানো। ভোটারদের বিভ্রান্ত না করে, স্পষ্ট পরিচয়ে, নীতির ভিত্তিতে রাজনীতি করাই হবে গণতন্ত্রের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
সময় এসেছে গুপ্ত রাজনীতির চর্চা পরিহার করে উন্মুক্ত, আদর্শভিত্তিক ও গণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার। এটা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার দাবিও বটে।