সম্পাদকীয়
হাসপাতালে দালালচক্র ও বেআইনি ক্লিনিকের জট
সাম্প্রতিককালে জনপ্রিয় মিডিয়া আউটলেট সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন যশোর জেনারেল হাসপাতালে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে উঠে আসে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিকটবর্তী বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে তাদের কাছ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কাহিনি। সংবাদ প্রকাশ/প্রচারের পর জেলা প্রশাসন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পাঠায়। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট দেখে দালালরা যথারীতি পালিয়ে যায়। ফলে প্রশাসনের এই তৎপরতা কতটা দুর্বল ও অকার্যকর, তা দিনের আলোর মতো প্রকাশ পেয়েছে।
প্রশ্ন হলো, বেআইনি উপায়ে সরকারি হাসপাতালের মাত্র ১০-২০ গজের মধ্যে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠলো কীভাবে? আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালের ৩০০ গজের মধ্যে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। কিন্তু যশোর জেনারেল হাসপাতালের ১০-২০ গজ বা তার সামান্য দূরে বহু বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চুটিয়ে ব্যবসা করছে। এতো বড় আইনলঙ্ঘন জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের চোখ এড়ায় কী করে? জনশ্রুতি আছে, সংশ্লিষ্টদের কাউকে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে চালানো সম্ভব। ফলে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্ছেদের কোনো উদ্যোগ কখনও চোখে পড়ে না।
এসব বেআইনি প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি ডাক্তাররা বেনামে পরিচালনা করেন; যা চাকরিবিধির গুরুতর লঙ্ঘন। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে যেসব ডাক্তার প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, তাদের প্রায় সবাই সরকারি চাকরি করেন। সমাজে তাদের প্রভাব নিতান্ত কম নয়। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান মালিক আর ডাক্তাদের সম্মিলিত দুষ্টুচক্র যখন এই কর্মে নিয়োজিত, তখন কে ঠেকায় তাদের? এমন অবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকে ‘আইওয়াশ’ বললে অত্যুক্তি হবে না। যতক্ষণ না মূল সমস্যা, অর্থাৎ বেআইনি ক্লিনিক ও সেখানে সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ হচ্ছে, ততদিন পরিস্থিতির উন্নতি দূরাশামাত্র।
এসব সংকট নিরসনে প্রথমেই দরকার সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারি হাসপাতাল থেকে যখন গ্রামের সাধারণ রোগীদের প্রতারণার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন কর্তারা কোথায় থাকেন? তাদের সহজ উত্তর, আড়াইশ’ শয্যার হাসপাতালে তার চার-পাঁচ গুণ রোগীকে হ্যান্ডেল করতে হয়। এর মধ্যে কে দালাল আর কে প্রকৃত রোগী তা চিহ্নিত করার মতো সামর্থ তাদের নেই।
এই জবাব সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এই শহরের লোকেরা যেখানে চিহ্নিত দালালদের নাম-ঠিকানা জানেন, কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য তারা রোগী ভাগানোর কাজ করেন, তা-ও জানেন, সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই যুক্তি ধোপে টেকে না।
সবশেষে আমরা বলবো, রোগীদের জীবন ও সহায়-সম্বল নিয়ে কোনো ধাপ্পাবাজি চলতে পারে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত অবশ্যই তাৎক্ষণিক কিছু সুফল দেয়। কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে অক্ষম। অবশ্যই জেলা ও স্বাস্থ্য প্রশাসনকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধি, দালালচক্রের মূল হোতা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে শাস্তি এবং বেআইনি ক্লিনিক উচ্ছেদ- এ তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় শর্ষের মধ্যে থাকা ভূত তাড়ানো অসম্ভব হবে এবং প্রতারিত হতেই থাকবে সহজ-সরল মানুষ।র