সম্পাদকীয়
যশোর জেনারেল হাসপাতালের সিসিইউ ও আইসিইউ
২০০৫ সালে যশোর জেনারেল হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটে স্থাপন করা হয়। এরও পর এখন থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে এই ভবনের চতুর্থ তলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)। অত্যাধুনিক বেড ও উন্নত মেশিনারিজে ঠাসা সেই আইসিইউ আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়নি। গণমাধ্যমকর্মীরা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তুললে একই উত্তর শুনতে পান- আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে সিসিইউ ভবনের চতুর্থ তলায়, আর সেখানে লিফট পৌঁছায় না। লিফট পৌঁছায় তিন তলা পর্যন্ত।
হাস্যকর ও লজ্জাজনক ব্যাপার হলো, দীর্ঘ পাঁচ বছরেও কর্তৃপক্ষ লিফট মাত্র একটি ফ্লোরে তোলার ব্যবস্থা করতে পারেনি। তাদের অজুহাত, ঠিকাদারের সঙ্গে দরদামে পটছে না। যেখানে চিকিৎসার মান এবং রোগীর জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, সেখানে প্রশাসনিক এই গাফিলতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে কর্তৃপক্ষ যা-ই বলুক, সাধারণ মানুষের ধারণা কিন্তু ভিন্ন। তাদের মতে, স্বাস্থ্য প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে আইসিইউ চালু করতে চাননি। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ হচ্ছে, অলিখিত কমিশনের বিনিময়ে গুরুতর রোগীদের বড় শহরের হাসপাতালে রেফার করা। এর ফলে সরকারি হাসপাতাল অচল রেখে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো লাভবান হচ্ছে।
এই ধারণা যদি সত্যি হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে এক ধরনের অপরাধ, চিকিৎসাবিদ্যার নীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি ছাড়া কিছুই হয় না।
অথচ, শুধু আইসিইউ নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রথম সরকারি করোনারি কেয়ার ইউনিটটির (সিসিইউ) চিকিৎসাও প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা দিয়ে জটিল রোগীদের দ্রুত ঢাকা বা খুলনায় রেফার করা হয়। প্রায় ৭-৮ কোটি টাকার মেশিনারি পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। এটা হলো সরকারি সম্পদের চরম অপচয় ও দুর্নীতির নিদর্শন।
পরিশেষে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দিতে হয়েছে যশোরের এই করোনারি কেয়ার ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার। যশোরবাসী এই সিদ্ধান্তে খুশি হলেও বড় প্রশ্ন হলো, এতো সামান্য ও প্রাথমিক বিষয়েও কেন প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হলো?
তাহলে স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্তাদের দায়িত্ব কী? যারা না পারেন অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করতে, না পারেন সরকারি হাসপাতালে দালালচক্র মুক্ত করতে, না পারেন প্রভাবশালী চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের কর্মে অবহেলা নিরোধ করতে। আর কথিত এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে না পারলে কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে একই গল্পের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য।