যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ৯ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মহৎ মানুষ সমাজের আগর গাছ

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : শনিবার, ৯ মে,২০২৬, ১১:০০ এ এম
মহৎ মানুষ সমাজের আগর গাছ

আমাদের মানবশিশুদের মধ্যে, বিশেষ করে ছেলেদের একটি বড় অংশ শৈশব হতে নানান ঘাত-প্রতিঘাত সামলে যৌবনের শুরুতে বা মাঝামাঝিতে হয়তো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। জীবন যুদ্ধে তারা সফল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবু তাকে সংগ্রাম করেই যেতে হয় আজীবন। সমাজে তাকে টিকে থাকতে হয় নানান কর্মের মধ্য দিয়ে। হয়তো জীবদ্দশায় অনেকে প্রকৃত মর্যাদাটাই পায় না। বেঁচে থাকতে হয়তো অনেকেই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, দুচ্ছাই করে, নিজেকে তার সঙ্গ হতে সরিয়ে রাখে। তারপর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সমাজে একটি ইতিবাচক রব প্রচারিত হয়। সে উদাহরণ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঘরে ঘরে শিশু সন্তানদের সামনে ওই মৃত ব্যক্তিকে উজ্জ্বল প্রাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেমনটা ঘরে সুবাস আনতে, শরীরে সুবাস আনতে আগর গাছের ব্যবহার হয়। যে আগর গাছ প্রাণ দিয়ে, শরীরে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে মানবসমাজে সুবাস ছড়িয়ে যায়।

আসলে বড় মানুষেরা, সফল মানুষেরা আগর গাছের মতোই প্রাণ দিয়ে মহাপ্রাণ হয়ে মানবের মাঝে অমরত্ব লাভ করে এবং সমাজে মহৎ মানুষের পরিচয় লাভ করে। তারা দেশ-দেশান্তরে সৌরভ ছড়ায়। প্রকৃত অর্থে মহৎ ব্যক্তিদের এক নিষ্ঠুর জীবনের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। তারপর শেষ জীবনে অথবা জীবন শেষে সুরভি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে জীবিত মানুষের মাঝে।

মাঝেমাঝে মনে প্রশ্ন জাগে- মানুষের জীবন কেন এমন হবে? জীবিত মানুষকে কেন কেবল যন্ত্রণাই পেতে হবে? বেঁচে থাকতে কেন সে সুবাস ছড়াতে পারে না? আগর গাছের জীবন কেন এমন হবে? যেখানে গাছে পেরেক মারা দণ্ডনীয় অপরাধ সেখানে কেন এতো অল্পবয়স হতে আগর গাছে শত শত পেরেক মারা হবে? এর জন্য কি কোনো আইন নেই? এর কোনো বিচার নেই? আসুন, জেনে আসি বাংলাদেশে আগর গাছে পেরেক মারার অপরাধে কোনো বিচার আছে কি না!

বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬ এর ধারা ৯ এর উপ-ধারা (১৩) অনুযায়ী ‘বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পেরেক বা কোনো ধাতব বস্তুর মাধ্যমে বৃক্ষের ক্ষতিসাধন করা যাইবে না।’ এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য আদালত অপরাধী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ বিশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করতে পারবেন।

এই ‘বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যতীত’ কথাটির ফাঁক দিয়েই আগর গাছ বেরিয়ে পড়েছে আইনি নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে। আগর গাছে লোহা বা পেরেক মারা হয় মূলত কৃত্রিম উপায়ে মূল্যবান সুগন্ধি ‘আগর কাঠ’ ও আতর তৈরির বাণিজ্যিক উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য। স্বাভাবিকভাবে আগর গাছে সুগন্ধি তৈরি হতে ২৫-৫০ বছর লাগে, যা অনেক দীর্ঘসময়। লোহার পেরেক মারলে তার পেরেকের চারপাশে পচন ধরে এবং গাছ নিজেকে রক্ষা করতে সেখানে কালো রঙের বিশেষ রজন বা আস্তরণ তৈরি করে। গাছের ভেতর ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সহজ হয়, যা গাছের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সুগন্ধি তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। সংক্ষেপে, কম সময়ে বেশি পরিমাণ আগর ও আতর উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আগর গাছে লোহা মারা হয়। সাধারণত ৬-১০ বছর বয়সী আগর গাছে লোহা মারা হয়। লোহা মারার ৩-৫ বছর পর গাছ কেটে ওই কালো অংশ থেকে সুগন্ধি আতর তৈরি করা হয়।

কাজেই আগর গাছে যেমন শত শত পেরেক মারা বৈধ তেমনি মহৎ প্রাণের যন্ত্রণায় জীবন যাবে এটাই নিয়ম। এখানে আক্ষেপ করার সুযোগ নেই। মহৎ প্রাণ মানুষের আদর্শ। তাই মানুষের প্রয়োজনেই এটা বৈধ। আগর গাছ কিছু বলতে পারে না, সে সুরভি হয়ে ছড়িয়ে যায়। এই মানুষেরাও তাই। নিজের অজান্তেই শুধু সুবাসিত হওয়ার অপেক্ষায় আজীবন তারা যন্ত্রণা সয়ে যায়। জীবনে সফল হলেই কোনো ব্যক্তি মহৎ হবে- এমন নয়। মহৎ তখনই হবে যখন সে আগর গাছের মতো সুবাস হয়ে উঠবে। সুতরাং মহৎ প্রাণ হয়ে সমাজে সুবাস ছড়াতে চাইলে জীবনযন্ত্রণাকে এড়িয়ে নয়, মাড়িয়ে যেতে হবে।

লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)