যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১১ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পশ্চিমবাংলায় বিজেপির উত্থান ও বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

বেনজীন খান

প্রকাশ : সোমবার, ১১ মে,২০২৬, ১২:০০ পিএম
পশ্চিমবাংলায় বিজেপির উত্থান ও বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

পশ্চিমবাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু একটি রাজ্যের সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি সমগ্র উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। ১৯৪৭-উত্তর পশ্চিমবাংলায় কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের পর এবারই প্রথম বিজেপি রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব পেল। এর মাধ্যমে পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

নির্বাচনি ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, টিএমসির নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম রয়েছেন। কংগ্রেস, সিপিএম, এআইএসএফ কিংবা এজেইউপি-এর ক্ষেত্রেও মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বিদ্যমান। কিন্তু বিজেপির ২০৪ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির সবাই হিন্দু। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; বরং বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি প্রতীকী সমাজচিত্র।

উপমহাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ যখন রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে একীভূত হয়, তখন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মুখোমুখি হয়। আসামে এনআরসি, সিসিএ বিতর্ক, নাগরিকত্ব প্রশ্ন এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে ঘিরে যে রাজনীতি গড়ে উঠেছে, পশ্চিমবাংলাতেও তার বিস্তার ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইতোমধ্যে তাদের গৃহীত বিতর্কিত এসআইআর সেই ইঙ্গিতকে পোক্ত করেছে।

আমরা আশঙ্কা করছি, পশ্চিমবাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব বৃদ্ধি পেলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ‘বিদেশি’, ‘বাংলাদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপে ফেলা হতে পারে। এমনকি সীমান্তবর্তী এলাকায় জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’-এর মতো অমানবিক পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি, মানবিক সংকট এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সংকটের বিশাল চাপ বহন করছে। লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষের দায়ভার নিয়ে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। এর মধ্যে যদি নতুন কোনো উদ্বাস্তু সংকট তৈরি হয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।

কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বাইরের শক্তি নয়; আমাদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। রাজনৈতিক বিভাজন, মতাদর্শিক সংঘাত, সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস আমাদের জাতীয় সংহতিকে দুর্বল করে তুলেছে। এ অবস্থায় কোনো উসকানি বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল নাগরিক এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা, প্রতিশোধ বা নিপীড়নের রাজনীতি আত্মঘাতী হবে। এটি শুধু মানবিক ও নৈতিকভাবে ভুল নয়; বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর।

আমরা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পাতা ফাঁদে পা দেবো না। আমরা সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার বদলে জাতীয় ঐক্যের পথ বেছে নিতে চাই। আমরা উসকানির বদলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা চাই। আমরা বিভক্তি নয়, সংযুক্তি চাই।

বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য, সীমান্ত ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, স্বাধীন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ, এবং সর্বোপরি জনগণকেন্দ্রিক দেশপ্রেম।

মনে রাখতে হবে, কোনো বিদেশি শক্তি তখনই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়, যখন একটি জাতি নিজের ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে। অতএব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রথম শর্ত হলো, সচেতনতা, সংহতি এবং আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন জাতীয় অবস্থান গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ কারও ঘৃণার প্রতিক্রিয়ায় ঘৃণার রাষ্ট্র হবে না। বাংলাদেশ হবে ন্যায়, মর্যাদা ও বহুত্ববাদী সহাবস্থানের রাষ্ট্র।

আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে আমরা আমাদের মূলমন্ত্র ঠিক করেছিলাম, ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার’। আমরা সেখান থেকে এক পাও বিচ্যুত হবো না।

নিশ্চয়ই শুভ বুদ্ধিই আমাদের রক্ষাকবচ।

১০ মে ২০২৬

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক, সংগঠক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)