সম্পাদকীয়
দৈনিক সুবর্ণভূমির ১০ মে সংখ্যাটি পড়ে যেকোনো সচেতন পাঠকের মন বিষাদে ভারাক্রান্ত হওয়ার কথা। ক্ষুব্ধও হবেন যে কেউ। একটি আঞ্চলিক পত্রিকায় একদিনে ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ- এমন অন্তত ছয়টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধেও শিক্ষাসফরে গিয়ে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। যে ঘটনাটি সুবর্ণভূমির জানা থাকলেও ভুক্তভোগীর অনীহা এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে কিনা তা যাচাই করতে সময় লাগায় পত্রিকাটি এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
প্রশ্ন হচ্ছে, একদিনে এতোগুলো খবর কি কাকতালীয় ঘটনা, নাকি সমাজের নৈতিক পতনের ইঙ্গিত?
বাস্তবতা হলো, এটা কাকতালীয় নয়। বরং এটি আমাদের সমাজের একটি ভয়াবহ চিত্রের আয়না। প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে আসে। বাদবাকিগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। কাকতালীয় এটুকুই যে, এদিন ঘটনাগুলোর বড় অংশই গণমাধ্যমে এসেছে।
গণমাধ্যমে আসা যৌন নির্যাতনের রাশি রাশি প্রতিবেদন আমাদের দেখায়, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাবিধানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এদিন প্রকাশিত খবরগুলোতে নির্যাতক হিসেবে অভিযুক্তদের অনেকেই সমাজের তথাকথিত ‘সম্মানিত’ অবস্থানে থাকা ব্যক্তি যেমন, রাজনৈতিক দলের নেতা, মসজিদের ইমাম, ডেন্টিস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
আমাদের রাষ্ট্র মূলত অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ওপর জোর দেয়। কিন্তু অপকর্ম প্রতিরোধ ও নৈতিক উন্নয়নে রাষ্ট্র ততটা মনোযোগী নয়। অগ্রসর দুনিয়ায় কারাগার বলতে এখন আর কিছু নেই, সবই রূপান্তরিত হয়েছে সংশোধনাগারে। পিছিয়ে আছি আমরা। এই স্বাধীন দেশে এখনও মূলত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি আইনে আমাদের কারাগার চলে।
আর নৈতিক শিক্ষা বলতে আমরা প্রধানত ধর্মীয় শিক্ষাকে বুঝি, যার কেন্দ্র মাদরাসা। অথচ সেই মাদরাসায়ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আছে। ধর্মীয় নেতাদের নারীলিপ্সার গল্পও সমাজে প্রচলিত। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, এই ‘নৈতিক শিক্ষা’ কতটা কার্যকর? যদি অকার্যকর বা পুরোপুরি কার্যকর না হয়, তাহলে কেন রাষ্ট্র নৈতিক শিক্ষার জন্য বাস্তবধর্মী ব্যবস্থাপনা তৈরি করবে না?
‘বাংলার সমাজ প্রীতিময়’ বলে একসময় সুনাম ছিল। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা এবং সামাজিক বন্ধন ছিল শক্ত। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আমাদের কি সেই পথ থেকে সরিয়ে নিচ্ছে? উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’- যা ই হোক না কেন, ব্যক্তিস্বার্থ, অশিক্ষা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, আইনের দুর্বল প্রয়োগ- সব মিলে এক বিষবৃক্ষ তৈরি হয়েছে।
সমাজটাকে সঠিক পথে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা ব্যক্তিপর্যায়ে অনেকেই করেন। কিন্তু রাষ্ট্র যদি উদ্যোগী না হয়, তবে সামগ্রিক অগ্রগতি অর্জন দুরূহ। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষায় জোর দেওয়া, প্রয়োজন আইনের কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ।
তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, সমাজের ‘মানুষ’ হিসেবে আমাদের বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে। যতদিন না প্রতিটি নাগরিক মনে প্রাণে উপলব্ধি করবেন যে, অন্যকে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই, ততদিন শুধু আইন বা শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।