সম্পাদকীয়
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে নেমেছে ধস। সাধারণ খুচরা ব্যবসায়ী, মওসুমি কারবারি ও মাদরাসা-সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে ঈদ-পরবর্তী প্রথম হাটেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হা-হুতাশ ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা অভিযোগ করছেন, পাইকাররা চামড়ার অযৌক্তিক ও নামমাত্র মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে পাইকারদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে এই করুণ অবস্থা; ট্যানারি মালিকরা সরকারনির্ধারিত দরের চেয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম নামিয়ে দেওয়ায় চামড়া বিক্রি করতে না পারায় তারা খুচরা ব্যবসায়ীদের ‘ন্যায্যমূল্য’ দিতে পারছেন না।
ফ্যাসিবাদী আমলে আওয়ামী লীগের অলিগার্কদের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় চামড়ার বাজারে ধস নামতো বলে ব্যাপক অভিযোগ ছিল। সেই অলিগার্কি কাঠামোর পতনের পর আশা জাগানিয়া অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি একজন ট্যানারি মালিকও। স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতির ইতরবিশেষ করতে পারেনি। একজন ট্যানারি মালিক যখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, তখন কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
এর পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরকার নির্ধারিত হলেও পরিস্থিতি মোটেই পাল্টায়নি। ইতিমধ্যে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলছেন অথবা নদীর পানিতে বা রাস্তাঘাটে ফেলে দিচ্ছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের এমন বিনাশ তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য সবিশেষ ক্ষতিকর। একসময় এই খাত থেকে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতো। এখন অসাধু চক্রের পাল্লায় পড়ে খাতটি প্রায় ধ্বংসের মুখে।
প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় সীমান্তে বাড়তি নজরদারি করতে হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি), যাতে কাঁচা চামড়া ভারতে পাচার ঠেকানো যায়। এর সরল অর্থ হলো, বাংলাদেশে চামড়ার দাম না মিললেও প্রতিবেশি দেশে ঠিকই মেলে। অথচ এখানকার ব্যবসায়ীরা বছরভর ধুয়া তোলেন যে, বাংলাদেশি পশুর চামড়ার মান খারাপ। তাহলে প্রশ্ন জাগে, তথাকথিত ‘খারাপ চামড়া’ কীভাবে ভারতে উচ্চমূল্যে বিকোয়?
আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে চামড়াজাত পণ্যের মূল্য ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। যে চামড়া ব্যবহার করে তৈরি পণ্য ব্যবসায়ীরা এতো উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন, সেই চামড়ার মান ‘খারাপ’ হয় কীভাবে? যুক্তির এই গোলকধাঁধায় স্পষ্টতই কোনো না কোনো পক্ষ মিথ্যা বলছে। বাস্তবতা হলো, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে ট্যানারি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পণ্য উৎপাদন- প্রতিটি স্তরেই নিয়ন্ত্রণ করছে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। তারা খুচরা পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য দিতে চান না, আবার ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের অতিরিক্ত দাম বসিয়ে দেন।
এমতাবস্থায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সরকারনির্ধারিত দাম কার্যকর করতে হলে পাইকারি ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকদের কর্তৃত্ব খর্ব করে অবশ্যই সরকারের দক্ষ জনবল নিযুক্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। পাচাররোধে বিজিবির অভিযান তখনই পুরোপুরি কার্যকর হবে, যখন অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা সংস্কার করা সম্ভব হবে।
অপচয় নয়, চামড়াকে মূল্যবান পণ্যে রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর এই হাহাকার ও অযৌক্তিক মূল্যহীনতার গল্পই চক্রাকারে ফিরতে থাকবে।