স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে জনগণ রাজপথে নেমে দাবি আদায় করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বিএনপি সরকারকে সাত দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সময় থাকতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিন।
অন্যথায় এক দফার আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো। এক দফার আন্দোলনের পরিণতি অত্যন্ত কঠিন হবে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে যশোরের মুরলী মোড়ে ঢাকা-খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া লংমার্চ উপলক্ষে আয়োজিত পথসভায় এসব কথা বলেন তিনি।
প্রায় ৯ মিনিটের বক্তব্যে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে গণভোটের রায় অস্বীকার, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দলীয়করণের অভিযোগ তোলেন জামায়াত আমির।
একই সঙ্গে সাত দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে সময় থাকতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
গণভোটের ফলাফল নিয়ে বিএনপি সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এর রায়ের আলোকে নতুন রাষ্ট্র গঠনে সংস্কার করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং করে জনগণের রায় ছিনতাই করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন।

অথচ বিএনপি ৫৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় বসেছে। এখন তারা বলছে, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য গণভোট মেনে নেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতায় বসার পর আর কিছু মানতে রাজি নয়।
গণভোটের রায় অস্বীকারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকার জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য ও অপমান করেছে। জনগণ তাদের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এর প্রতিশোধ নেবে।
সাত দফা দাবির মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, এখনো সময় আছে। সময় থাকতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিন। সময় চলে গেলে কেউ আর আপনাদের দিকে ফিরে তাকাবে না।
কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব কার্ডের মাধ্যমে যদি জনগণের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে কার্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কোথায়? জনগণের তহবিলের অর্থে এসব কার্ড বিতরণ করা হলে অনেক মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কেন?
এ প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, সম্ভবত কার্ডগুলো পুকুরপাড়ে চলে গেছে। রাতের বেলা বিতরণ করা হবে। জনগণকে নিয়ে এ ধরনের তামাশা আর দেখতে চায় না।
তিনি বলেন, গণভোটের জনরায় অস্বীকার করার মাসুল সরকারকে দিতে হবে।
মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি বলেন, এই রায় বাস্তবায়ন জনগণ আদায় করে ছাড়বে। এ বিষয়ে আর কোনো ‘কিন্তু’ বা ‘অতঃপর’ নেই।
এক দফার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, নারী-পুরুষ লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছেন।
জীবন দেবো, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবো না। এক দফার ডাক প্রয়োজন হলে তা দেওয়া হবে।
তিনি বিএনপি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, এক দফার আন্দোলনের আগে সাত দফা মেনে নিন। এক দফার ওজন এত বেশি যে এর চাপে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারেন।
অতীতে যারা এক দফার আন্দোলনের কবলে পড়েছে, তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।
আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ঘোষণা দিতে হবে যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হবে। এমন ঘোষণা দিলে আর লংমার্চ করতে হবে না।
তবে অতীতে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করায় বিএনপিকে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারকে সতর্ক করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের পথে যারা হাঁটবে, তাদের দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। তারা জনগণের ভালোবাসা নয়, ধিক্কার পাবে।
তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের অতীতের নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সাড়ে ১৫ বছর তারাও মজলুম ছিলেন, জামায়াতও মজলুম ছিল। মজলুমরা জালিম হয়ে উঠুক, তা তারা চান না।
কিন্তু বিএনপি ইতিমধ্যে যে কর্মকাণ্ড করেছে, তাতে আবারও জাতির ওপর জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
লংমার্চের উদ্দেশ্য তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, চাঁদাবাজি, দখলদারি, দুর্নীতি ও দলতন্ত্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তারা রাজপথে নেমেছেন। জনগণকে শাস্তি দেওয়া বা নিজেদের কোনো দাবি আদায় তাদের উদ্দেশ্য নয়।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে আন্দোলন করছে। জনগণ রাজপথে নেমে দাবি আদায় করে ছাড়বে।
বক্তব্যের শেষ দিকে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি, আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন? দুঃখ-কষ্টে থাকবেন? বিপদে-মসিবতে থাকবেন? লড়াইয়ের ময়দানে থাকবেন? রাজপথে থাকবেন? তাহলে প্রস্তুত হন।’
এর আগে বক্তব্যের শুরুতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে লংমার্চে অংশ নেওয়া নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান ডা. শফিকুর রহমান।
ঢাকা থেকে যশোরে আসার পথে বিভিন্ন স্থানে নারী-পুরুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মুরলী মোড়ের জনসমাগমকেও আন্দোলনের প্রতি মানুষের সমর্থন হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা কোনো দলের বা নেতার ব্যক্তিগত দাবি নয়, এটি জনগণের দাবি। সেই দাবি আদায়েই ১১ দল রাজপথে নেমেছে।
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর জেনারেল সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি