কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে রোপণ করা গাছের কোনো হদিস নেই। কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় চলতি বছরের জুনের মধ্যে ২৭ হাজার ৯৫০টি গাছ রোপণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কৃষিবিভাগ।
গত ৪ জুনে ইস্যুকৃত সরকারি আদেশে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮২ লাখ আট হাজার পাঁচশ টাকা।
৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে সরকারি কোষাগারে হিসাব সমন্বয়ের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু কুষ্টিয়া জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে গত অর্থবছরে বৃক্ষ রোপণে বরাদ্দের টাকা জুন মাসের মধ্যে সমন্বয়ও করেনি সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ। এছাড়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ ব্যয়ে উপজেলাওয়ারী বৃক্ষ রোপণের নামকাওয়াস্তে কাগুজে তালিকা প্রদর্শনের চেষ্টা করলেও বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব দেখাতে পারেনি জেলা ও উপজেলার কৃষি বিভাগ।
বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সভাপতি জেলা প্রশাসক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে গাছ/বৃক্ষের চারা, সারসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রণোদনা উপকরণ বাবদ জেলার ছয়টি উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮২ লাখ সাড়ে আট হাজার টাকা। এই টাকা ব্যয়ে ২৮ হাজার বৃক্ষ রোপণ বাস্তবায়ন হবে। প্রতি একটি গাছ/বৃক্ষরোপণ বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ২৯৩ টাকা ৬৮ পয়সা।
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে- কুষ্টিয়া সদরে পাঁচ হাজার ৫০টি গাছ রোপণের জন্য ১৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, কুমারখালীতে চার হাজার ৮৫০টি গাছ রোপণে ১৪ লাখ ২৪ হাজার ২৫১ টাকা, খোকসায় সাড়ে তিন হাজার গাছের বিপরীতে দশ লাখ ২৭ হাজার ৮১০ টাকা, মিরপুরে চার হাজার ৭৫০টি গাছ রোপণে ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৮৫টাকা, দৌলতপুরে পাঁচ হাজার আটশ চারার জন্যে ১৭ লাখ তিন হাজার ২২৪টাকা এবং ভেড়ামারা উপজেলায় চার হাজার ২৫০টি গাছ রোপণের জন্যে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে।
তবে, সরেজমিন ছয়টি উপজেলায় সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ খাতে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ ব্যয়ে চারা বা গাছ রোপণের কোনো দৃষ্টান্ত মেলেনি।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাগণের সাথে কথা আলাপকালে গেলো অর্থ বছরের ৩০ জুনের মধ্যে গাছ রোপণের বিষয়ে তাদের দেওয়া তথ্যের কোনো সত্যতা মেলেনি।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন তার উপজেলায় সাড়ে আটশ’ গাছ রোপণের কথা জানান। ভেড়ামারা উপজেলা কৃষি অফিসার মাহমুদা সুলতানা জানান, সরকারি প্রণোদনায় চলমান বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশ গাছ লাগানো হয়েছে।
মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইস্যুকৃত জিওতে প্রতিটি গাছের জন্য ৩০ কেজি গোবর সার দেওয়ার কথা ছিল, যার ব্যয় ধরা হয় ১২০ টাকা। সেটা সংশোধন হয়ে প্রতি গাছের জন্য গোবর সার ধরা হয়েছে পাঁচ কেজি হিসেবে এবং ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। এই সংশোধিত জিও'র নির্দেশনা মতে ইতিমধ্যে আমরা অতিরিক্ত টাকা সরকারি কোষাগারে চলানের মাধ্যমে জমা দিয়েছি। এখন সংশোধিত হিসেব মতে অর্থ ব্যয় সাপেক্ষে গাছ রোপণ কর্মসূচি চলমান আছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রূপালী খাতুন তিনিও মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মতো অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, গত ৩০ জুনের মধ্যে আমরা বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছি। এখনও তা চলমান।
এদিকে, কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রাইসুল ইসলাম এবং কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল নোমান অভিন্ন দাবি করে বলেন, সরকারি প্রণোদনায় বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চারা/গাছ উপজেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। যদিও এই দুই কর্মর্কর্তার দেওয়া তথ্যের সরেজমিন কোনো সত্যতা প্রমাণ করতে পারেননি।
এ বিষয়ে ক্লিন কুষ্টিয়া ও গ্রিন কুষ্টিয়ার পরিচালক এবং কুষ্টিয়া জেলা বিএনপি'র সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘সম্প্রতি কৃষি বিভাগ থেকে আমাদের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীতে দুই দফায় প্রায় ছয়শ চারা দেওয়া হয়েছে। তবে, এই সংখ্যা উনাদের লক্ষমাত্রা অনুযায়ী যথেষ্ট কি না সে বিষয়ে আমার জানা নেই। উনাদের দেওয়া চারাগুলি রোপণের যাবতীয় প্রাসঙ্গিক খরচ আমার সংগঠনের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে চারা রোপণে সারসহ সুরক্ষা উপকরণ বাবদ কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি।’
সামাজিক বন বিভাগ কুষ্টিয়ার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল আলম বলেন, ঘোষিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী, ভেড়ামারা ও মিরপুর তিনটি উপজেলায় সামাজিক বন বিভাগের উদ্যোগে ১৫ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিটি চারার মূল্য নয় টাকা এবং প্রতিটি গাছের সুরক্ষা ব্যয় হয়েছে ২০ টাকা।
সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন খাতে বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের সদস্য সচিব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালনক ড. মো. শওকত হোসেন ভুঁইয়ার সাথে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় প্রায় ৮২ লাখ টাকা প্রাক্কলন ব্যয়ে প্রায় ২৭ হাজার ৯৫০টি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ৬২ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
এই প্রকল্পের সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক বৃক্ষরোপণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে। প্রকল্প বাস্তবায়নশেষে কৃষি বিভাগের রিপোর্টিং করার কথা, সেটা এখনও আমার কাছে আসেনি। রিপোর্টে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে সেটা তদন্ত করে দেখা হবে।