ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর ও অপসারণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে ঢাকা থেকে আসা বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি প্রতিনিধি দল।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত ভাস্কর্য চত্বর পরিদর্শন শেষে তারা ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সেখানে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে ভাস্কর্য ভাঙচুরের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবিলম্বে তা পুনঃনির্মাণের দাবি জানানো হয়। পাঁচ সদস্যের এই প্রতিনিধি দলটি পরে জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে।
প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ‘দৈনিক অগ্রদূত’ সম্পাদক আবু সাঈদ খান, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফারাহ তানজীম তিতিল এবং নাগরিক সমাজের সদস্য দীপায়ন দিশা।
সমাবেশে আবু সাঈদ খান বলেন, ২৪-এর গণআন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কিছু অপশক্তি পরবর্তীতে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়। তারা একের পর এক মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্নে হামলা চালিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাতেই জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছে, কিন্তু কোনো কিছুই মহান মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প হতে পারে না। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি দিনদুপুরে ভাঙা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা প্রশাসনের কাছে জড়িতদের পরিচয় জনসম্মুখে প্রকাশ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের জন্মস্থান ঝিনাইদহে তার ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। ১৯৭১ সালে আমাদের রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি, যারা বাংলাদেশকে স্বীকার করে না, তারাই এই ঘৃণ্য কাজটি করেছে। প্রশাসনকে প্রথম দিকে এ দায় অস্বীকার করার ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে এটি পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের এই ভাস্কর্য আমাদের প্রাণের অস্তিত্ব। দিনদুপুরে এটি উপড়ে ফেলার চেষ্টা হলেও প্রশাসন কিছু জানে না বলাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। উগ্র ধর্মীয় ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যে গোষ্ঠী এই কাজ করেছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং ভাস্কর্যটি আরও সুন্দরভাবে পুনঃনির্মাণ করতে হবে।
শিক্ষক ফারাহ তানজীম তিতিল বলেন, বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য ভাঙচুর কোনো ছেলেখেলা নয়, এটি জাতীয় চেতনা ও অস্তিত্বের বিষয়। অপরাধীদের আড়াল করা প্রশাসনের কাজ নয়। প্রশাসন যদি বিকল্প স্থানে ভাস্কর্য স্থানান্তরের পরিকল্পনা করে, তবে তা মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় নাগরিকদের মতামত নিয়েই করতে হবে। দুষ্কৃতকারীদের আড়াল না করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।

নাগরিক সমাজের সদস্য দীপায়ন দিশা বলেন, শহরের প্রধান প্রবেশমুখে দিনদুপুরে ভাস্কর্য ভাঙা হলেও প্রশাসন দেখতে পায়নি, এমন দাবি রহস্যজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
উল্লেখ্য, ঝিনাইদহ শহরের বাসটার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরের ভাস্কর্য নিয়ে ‘কে ভাঙছে জানে না কেউ’ শিরোনামে গত ১৫ জুলাই জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক ভাস্কর্য অপসারণের কাজ স্থগিত ঘোষণা করেন।