যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পিঠে বড়শি গেঁথে শূন্যে ঘুরলেন সাত ‘সন্ন্যাসী’

তারেক মাহমুদ

, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল,২০২৬, ১০:০৬ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল,২০২৬, ১১:২২ পিএম
পিঠে বড়শি গেঁথে শূন্যে ঘুরলেন সাত ‘সন্ন্যাসী’

বড়শিতে গাঁথা মানুষ। ‘চড়ক গাছের’ এক মাথায় ঝুলিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট শূন্যে ঘুরতে ঘুরতে ‘সন্ন্যাসী’ অসিত কর্মকার মনা ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন বাতাসা। মনার মতো একে একে সাত সন্ন্যাসী পিঠে বড়শি বিঁধে শূন্যে ঘুরে পালন করলেন শিবপূজার অংশ চড়ক উৎসব।

লোকসংস্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে গা শিউরে উঠা এ চড়ক উৎসব দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু।

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর বাজারের বকুলতলায় প্রতি বছরের ন্যায় বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহি এ চড়ক উৎসব।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় ২০০ বছর আগে অবিভক্ত বাংলার জজ সাহেব ননি বাবু এ মেলার প্রচলন করেন। তিনি ফতেপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এরপর থেকে চলে আসা এ মেলা স্থানীয় মানুষের কাছে সাংস্কৃতির ঐতিহ্য আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জীবন্ত দলিল হয়ে ফিরে আসে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে।

মহেশপুর শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ফতেপুরের বকুলতলা বাজার। বকুলতলা বাজারে ভারতীয় পঞ্জিকামতে ২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয় চড়ক উৎসবটি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নানা আয়োজনে এ পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকেন। প্রতি বছর এই পুজার মুল আকর্ষণ সন্ন্যাসীদের পিঠে বড়শিবিদ্ধ করে শূন্যে ঘোরা। এবছর সাত ‘সন্ন্যাসী’ বড়শি (বান) ফুঁড়িয়ে শূন্যে ঘুরলেন।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাজির হয় হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু। দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে মেলা প্রাঙ্গনে। বিকেলের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো এলাকা। পুরো এলাকা জুড়ে উৎসবের আমেজ। ঠিক বিকেল সাড়ে চারটা বাজার সাথে সাথে নয় সন্ন্যাসী অসিত কর্মকার মনা, বিপ্লব কর্মকার, ভিম হালদার, বাসুদেব কুমার, অধির কুমার, মহাদেব হালদার, সাধন বাবু রায়, আনন্দ কুমার বিশ্বাস ফতেপুর বাঁওড়ে স্নান করেন। এরপর তারা মাটির কলসে জল ভরে মাথায় নিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গনের চড়ক গাছের গোড়ায়। ঠিক ৪ টা ৩০ মিনিটে প্রথমে অসিত কর্মকার মনার পিঠে দুটি বড়শিবিদ্ধ করা হয়। এরপর তাকে ঝুলিয়ে দেয়া হয় চড়ক গাছে। অপর গাছের অপর প্রান্তে থাকা কপিকলের বাঁশ জোরে জোরে ঘোরাতে থাকেন ২০ থেকে ২৫ যুবক। চড়ক গাছে লটকে দেওয়ার সাথে সাথে কিছু মহিলা তাদের এক দেড় বছরের শিশু সন্তানকে তুলে দেন সন্ন্যাসীদের কোলে। শিশুদের নিয়েই শূন্যে ঘুরতে থাকেন সন্ন্যাসীরা। এ অবস্থায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাতাসা, মিষ্টি।

এভাবেই বড়শিতে বিঁধে চার-পাঁচ পাক শূন্যে ঘুরে নেমে আসেন অসিত কর্মকার। এ নিয়ে ২৩ বার চড়ক গাছে চড়লেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, সবাই চড়ক গাছে উঠতে পারে না। উঠতে গেলে অনেক সাহস লাগে। মনার পর একে একে বিপ্লব কুমার, বাসুদেব কুমার, মহাদেব কুমার ও অধির কুমারসহ সাতজন শূন্যে ঘোরেন একই কায়দায়।

স্থানীয়রা জানান, আগে শুধুমাত্র পিঠে বান ফুঁড়িয়েই ঝুলিয়ে দেওয়া হতো চড়ক গাছে। আর সে অবস্থাতেই ঘোরানো হতো। প্রায় ১১৫ বছর পূর্বে এক সন্ন্যাসীর পিঠের চামড়া ছিড়ে পড়ে আহত হওয়ার কারণে বড়শির উপর এখন গামছা পেঁচিয়ে দেওয়া হয়।

‘সন্ন্যাসী’ বিপ্লব কর্মকার জানান, শিব ঠাকুরের সন্তুষ্টির জন্যই তারা প্রতি বছর চড়ক গাছে চড়ে থাকেন। শরীরে বড়শী বিধার ফলে বড় ধরণের ক্ষতের সৃষ্টি হলেও সামান্য রক্ত বের হয়। চড়ক গাছ থেকে নামিয়ে গাছের গোড়ায় থাকা সিঁদুর টিপে দিলেই হয়।

‘সন্ন্যাসীরা’ জানান, পূর্ব পুরুষদের কাছে শুনেছেন দুইশত বছর আগে এখানে চড়ক পুজা শুরু হয়। আগে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে এ পূজার আয়োজন করা হতো। সেই স্থানে সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প করায় এখন ফতেপুর বকুলতলার বাজারে হচ্ছে।

মেলায় আসা মিষ্টির দোকানি সুখদেব কুমার বেচাকেনা বেশ ভালোই হচ্ছে বলে জানান। মেলার আরেক প্রান্তে কথা হলো শাঁখা-সিঁদুর বিক্রেতা প্রকাশ বিশ্বাসের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমি এ মেলায় প্রতিবারই আসি, এবার বিক্রি ভালো হয়েছে।’

পূজা ও মেলা কমিটির সভাপতি সাধন কুমার ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক সুবল কর্মকার জানান, চড়ক পূজা মূলত শিবপূজারই অংশ। এতে নানা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে, সাথে লোকজ মেলা বসে। উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী এসে যোগ দেন। প্রায় ২০০ বছর আগে অবিভক্ত বাংলার জজ সাহেব ননি বাবু এ মেলার প্রচলন করেন।

 

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)