মেহেরপুর প্রতিনিধি
একটি ভ্যান চুরি গেছে, সঙ্গে থমকে গেছে একটি অসহায় পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
এনজিওর ঋণের টাকায় কেনা ভ্যানটি চুরি হওয়ার পর চারজন প্রতিবন্ধীসহ সাত সদস্যের পরিবার এখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। যে ভ্যানের আয়ে চলতো সংসার, পরিশোধ হতো ঋণের কিস্তি, সেটি হারিয়ে এখন দুবেলা খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে পরিবারটির জন্য।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধলা গ্রামের অসহায় ভ্যানচালক আব্দুল লতিফ। পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল একটি ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যান। এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় ভ্যানটি কিনেছিলেন তিনি। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলতো সাত সদস্যের সংসার। সেই টাকাতেই পরিশোধ করতেন এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তি।
কিন্তু মাত্র একটি মুহূর্তের অসতর্কতায় ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবারটি। পাঁচদিন আগে বাড়ির উঠানে ভ্যানটি রেখে পাশেই পলিথিনে মোড়ানো ছোট্ট ছাপড়ির নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আব্দুল লতিফ। ক্লান্ত শরীর ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা নিজেও বুঝতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতেই দেখেন, তার একমাত্র সম্বল ভ্যানটি নেই। চুরি করে নিয়ে গেছে অজ্ঞাত কেউ। এরপর থেকেই অন্ধকার নেমে এসেছে অসহায় পরিবারটিতে।
লতিফের সাত সদস্যের পরিবারে চারজনই প্রতিবন্ধী। স্ত্রী ও দুই ছেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ছেলের স্ত্রীও শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের সবাই নির্ভরশীল ছিলেন আব্দুল লতিফের আয়ের ওপর। কিন্তু ভ্যান হারানোর পর গত পাঁচদিন ধরে ঠিকমতো রান্নাই হয়নি তাদের ঘরে। কখনো একবেলা, কখনো না খেয়েই কাটছে দিন।
মানবিক দিক বিবেচনায় গাংনী থানা পুলিশ কিছু খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। সেই সহায়তায় কোনোভাবে দিন পার করছে পরিবারটি। তবে সামনে এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ আরও বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেশীরা বলছেন, এমন অসহায় পরিবার এলাকায় খুব কমই আছে। এখন পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেশী নাজিম উদ্দীন ও রোকেয়া খাতুন বলেন, এই এলাকার একজন হতদরিদ্র মানুষ আব্দুল লতিফ। তার কোনো জমি জায়গা নেই। ভ্যানটি কিনেছিলেন সমিতি (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে। সেটি চুরি হয়ে যাওয়ায় প্রতিবন্ধী সন্তান-সন্ততি নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন লতিফ। পাড়ার লোকজন যা দিচ্ছে এখন তাই দিয়েই এক বেলা পর একবেলা খাচ্ছেন তারা।
আব্দুল লতিফ বলেন, ‘ভ্যানটাই ছিল আমার সব। এটা দিয়েই সংসার চলতো। এখন কিস্তি শোধ করবো কীভাবে, পরিবার চালাবো কীভাবে বুঝতে পারছি না।’
কাথুলি ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ফারুক হোসেন বলেন, ‘চেয়ারম্যানের সাথে কথা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তাকে সহায়তা দেওয়ার।’
গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, অসহায় পরিবারটির হাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ টাকা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশ ভ্যানটি উদ্ধার ও চোর শনাক্তে কাজ করছে। উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি এলাকার বিত্তবানদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন তিনি।