সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, ঝিকরগাছা থেকে ফিরে
আরিফের ১১টি বছর কেটেছে প্রবাসের মাটিতে। অপেক্ষার পালা শেষে বুকভরা আশা নিয়ে মা তার আরও দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলেন আরিফকে বিমানবন্দর থেকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সেই আনন্দের মুহূর্তেই রূপ নিলো এক অন্তহীন কান্নায়। নিজভিটায় আর পা রাখা হলো না মালয়েশিয়া প্রবাসী তরুণ আরিফ ইসলামের।
দুর্ঘটনায় আরিফ, তার মা, ভাই, বোনসহ মারা গেছে পাঁচজন। গুরুতর আহত হয়েছে দুই শিশু, যারা আরিফের ভাগনি ও ভাগনে।
মঙ্গলবার ভোরে যশোরে ফেরার পথে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডার বোঝাই ট্রাকের পেছনে প্রাইভেটকারের প্রচণ্ড ধাক্কায় প্রাণ যায় একই পরিবারের চারজন ও প্রাইভেটকার চালকের। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের খোশালনগর-বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান (৫০), তার মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে আরিফ ইসলাম (২৪), ছোট ভাই রাকিব (১৮), একই গ্রামের ইলিয়াস হোসেনের স্ত্রী ও প্রবাসী আরিফের বোন আয়শা বেগম (২৮) এবং প্রাইভেটকারটির চালক জাহিদ হোসেন। তিনি মণিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামের মো. ইসলামের ছেলে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে প্রবাসী আরিফের ভাগনে ও ভাগনি হুসাইন (৮) ও তাসফিয়া (৩)। ফরিদপুরের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নিহত আরিফের চাচা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় আমি আরিফের সাথে থাকতাম। ঈদের আগে দেশে ফিরেছি। আরিফের আসার কথা শুনে তার মা, ভাই, বোন ও দুই ভাগনে-ভাগনি তাকে আনতে ঢাকায় যায়। যশোরে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। লাশ আনার জন্য ফরিদপুর মেডিকেলে স্বজনরা পৌঁছেছেন।’
ভাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন ম্যানেজার আবু জাফর জানান, মালয়েশিয়া থেকে ফেরা আরিফকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিয়ে প্রাইভেটকারটি যশোরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। ভোরে এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম এলাকায় সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডারভর্তি ট্রাকের পেছনে প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি ধাক্কা দেয়। গতি বেশি থাকায় প্রাইভেটকারটি দুমড়ে-মুচড়ে ট্রাকের নিচে ঢুকে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে একজন মারা যায়।
শিবচর হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নুর আলম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে। দুর্ঘটনার পর ট্রাকটিকে জব্দ করা হলেও এর চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাড়ির আসার আগে এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো ঝিকরগাছা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গোটা গ্রামের বাতাস।
ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম কিবরিয়া হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ভোরে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় ঝিকরগাছার একই পরিবারের চারজন ও মণিরামপুরের একজন নিহতের ঘটনা জানতে পেরেছি।’