যাপিত জীবন
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
ধানের দ্বিপদী বা বৈজ্ঞানিক নাম Oryza sativa. `oryza' নামটি কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৩ সালে নির্বাচিত করেন। ১৯১০ সালে জাপানি বিজ্ঞানী কুয়াদা ধানের haploid chromosome সংখ্যা নির্ধারণ করেন। আর ঊনিশশ’ ষাটের দশকের আগে ধানের গোত্রকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়নি। লাতিন oryza শব্দটির মূল ὄρυζα (óryza), যার অর্থ ‘ধান’। আর ‘প্রজাতি’ নাম লাতিন sativus অর্থ ‘বপনকৃত’ অর্থাৎ মানুষ যা রোপণ বা চাষ করে’।
সংস্কৃত ‘ধান্য’ থেকে বাংলায় ‘ধান’ এসেছে। ধানের মূলানুগ অর্থ ‘যা পোষণ করে বা যে শস্য দিয়ে দেহপোষণ হয়’। সংস্কৃত ‘ধান্য’ শব্দের এ অর্থ বিবেচনায় গম, যব, ভুট্টা ইত্যাদিও ধান্য। কিন্তু বাংলায় ‘ধান’ বলতে কেবল যার থেকে চাল বের করা হয় সেটাকে বোঝায়। প্রাচীনকালে ‘ধান্য’ ও ‘ব্রীহি’ এক ছিল। অমরকোষে ‘ধান্যং ব্রীহিঃ’, মেদিনীকোষে ‘ধান্যং ব্রীহিষু এবং হেমচন্দ্রকোষে ‘ধান্যস্ত শস্যাং’ উল্লেখ রয়েছে।
তুষযুক্ত থাকলে তাকে ধান বলে। ধানকে তুষমুক্ত করলে তা হয় চাল, আর চাল সিদ্ধ করলে হয় অন্ন।
সংস্কৃত ভাষায় ধান্যকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা শালি, ব্রীহি, শূক, শিম্বি ও ক্ষুদ্র। শালি হলো সেই শস্যদানা, বাংলা ভাষায় যাকে ‘ধান’ বলা হয়। এ শস্যদানা তুষযুক্ত অবস্থায় ধান, তুষছাড়া করলে চাল এবং সিদ্ধ করলে ভাত হয়। ব্রীহিধান্য হলো তিল; শূকধান্য হলো যব ও গম; শিম্বিধান্য হলো কলাই এবং ক্ষুদ্র ধান্য হলো কাউন। তবে সংস্কৃত ভাষায় ধান্য বলতে যা-ই বুঝানো হোক না কেন, বাংলা ভাষায় ধান বলতে কেবল শালিধান্যকে বোঝায়, যার থেকে চাল বের করে সিদ্ধ করলে ভাত হয়।
আবার সংস্কৃত ধা+অন যোগে গঠিত ধান অর্থ আধার, আশ্রয়, ভাণ্ডার, স্থান বা জায়গা। এ ধানের স্ত্রীলিঙ্গ ধানী। ধান অর্থে ‘ধান্য’ শব্দেরও ব্যবহার রয়েছে (পরান মণ্ডলের নিকট খাজনা বাকী, আমরা তাহার ধান্য ক্রোক করিব- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।
রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণে যেসব ধানের উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে আজান আন্ধারকুলি, আমপাবন, আমলো, আলাচিত, আসতির, আসঅঙ্গ, উড়াসালী, ককচি, কনকচুর, কাঁঙদ, কামদ, কালাকাত্তিক, কালাযুগর, কুসুমমালী, কোটা, খীরকম্বা, খেজুরছড়ি, খেমরাজ, গআবালি, গন্ধতুলসী, গন্ধমালতী, গুজুরা, গোতমপলাল, গোপালভোগ, চন্দনসাল, ছিছরা, জলরাঙ্গি, জেঠ, জোলি, ঝিঙ্গাসাল, টাঙ্গন, তসরা, তিলসাগরি, তুলানধান, তুলসালি, তোজনা, দলাগুড়ি, দাড়, দুধরাজ, নাগরজুগান, পলাল, পর্ব্বতজিরা, পাঙ্গুসিয়া, পাতল, পাথরা, ফেফেরি, বককড়ি, বন্ধি, বালি, বিদ্ধসালী, বুখি বুড়ামাত্তা, ভজনা, ভাদোলী, ভাদ্দমুখি, মইপাল (মহীপাল), মাধবলতা, মুক্তাহার, মুলামুক্তাহার, মৌকলস, রঙ্গসাল, রাঅগড়, রাজদল, লতামৌ, লাউসলী, লালকামিনি, বাঁকই, বাঁকচুর, বাঁকসাল, বাগনবিচি, বাসকটা, বাঁজগজা, বাসমতী, বোআলি, সনাখড়কি, সালছাটী, সীতাসালী, সোলপনা, হরি, হরিকলি, হাতিপাঞ্জর, হুকুলি। সূত্র: জ্ঞানেন্দমোহন দাস। তিনি তাঁর অভিধানে সপ্তদশ শতাব্দীর বাংলা গ্রন্থে যেসব ধানের উল্লেখ রয়েছে, সেগুলোর একটি তালিকা দিয়েছেন। যেমন হরিশঙ্কর, হাতিপঞ্জর, হুড়া, হরকুলি, হাতিপাদ, হিঞ্চি, হলুদগুঁড়া, কেলেকানু, কেলেজিরা, কালিয়া, কার্ত্তিকা কয়াকচ্চা, কাশীফুল, কপোতকণ্ঠিকা, কালিন্দী, কটকী, কুসুমশলী, কনকচুর, দুধবাজ, দুর্গাভোগ, পর্দ্দেশী ধুস্তুর, কৃষ্ণখালী, কোঙরভোগ, কোঙরপূর্ণিমা, কল্মিলতা, কনকলতা, কামোদ, খেজুরথুপী, খয়েরশালী, ক্ষেম, গঙ্গাজল, গয়াবলি, গোপালভোগ, গৌরীকাজল, গন্ধমালতী, গুয়াথুপী, গুণাকর, চামরঢালি, বন্দনশালী, ছত্রশালি, জটাশালি, জগন্নাথভোগ, জামাইলাড়ু, জলারাঙ্গী, ছিঙ্গাশালী, বলাইভোগ, ধুল্যা, নিমুই, নন্দনশালি, রূপনারায়ণ, পাতসাভোগ, পায়রারস, পিঁপীড়াবাঁক, তিলসাগরী, বাঁকশালি, বাঁকোই, বুয়ালি, দাড়বঙ্গী, বাঁকচুর, বুড়ামাত্রা, রামশালি, রাঙ্গী, রাঙ্গামেট্যা, রামগড়, রঙ্গয়করি, পুণ্যবতী, নছীপ্রিয়, লাউশালি, লক্ষ্মীকাজল, ভোজনা, ভবানীভোগ, সীতাশালি, শঙ্করশালি, শঙ্কর জটা।
ধানের নাম বাংলায় ধান, ধান্য; ইংরেজিতে rice, asian rice, common rice, cultivated rice, paddy, red rice; অসমিয়ায় ধান; হিন্দিতে চাবল; কন্নাড়ায় akki, bhatta; মালয়ালমে ari, navaranellu, nellu; মণিপুরীতে phaou; মারাঠিতে tandul, bhat, pendha; উড়িয়ায় dhano; সংস্কৃতে dhanya, dhanyah, garuda; তামিলে arishi, arisi, nellu; তেলেগুতে biyam, biyyam, dhanyamu; উর্দুতে chawal; মিজো ভাষায় buh; আরবিতে আর্জ; ব্রাজিলিয়ান পর্তুগিজে arroz (আহোস) কিন্তু ইউরোপিয়ান পর্তুগিজে arroz (আরোস); চাইনিজে পামি; ক্রোয়েশিয়ানে riža (রিজা); চেকে rýže (রিজে); ডেনিশে ris (রিস্); ডাচে rijst (রিস্ত); ইউরোপিয়ান স্পেনিশে arroz (আরোস) কিন্তু লাতিন আমেরিকান স্পেনিশে arroz (এরুস); ফিনিশে riisi (রিসি); ফ্রেঞ্চে riz (রি); জার্মানে Reis (রাইস); গ্রিকে ρύζι (রিজি); ইতালিয়ানে riso (রিজো); জাপানিজে খোমে; কোরিয়ানে ছায়ে; নরওয়েজিয়ানে ris (রিস্); পোলিশে ryż (রিস্); রুশে рис (রিস্); সুইডিশে ris (রিজ); থাই ভাষায় খাউ; তুর্কিতে pirinç (পিরিস)।
ধান বাঙালির জীবনে জীবন ও সমৃদ্ধির প্রতীক। ধানকে কেন্দ্র করে বাঙালি জীবনে বহু উৎসব ও পরম্পরা তৈরি হয়েছে। বিখ্যাত নবান্ন ও পৌষ সংক্রান্তি ইত্যাদি উৎসবগুলি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ফসল তোলার প্রথম দিনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা সাহিত্যেও ধান ও ধানক্ষেতের সৌন্দর্য নিয়ে বহু ছড়া, কবিতা, গান লেখা হয়েছে।