পরিচ্ছদ
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
পাগড়ি প্রধানত দেশ ও অঞ্চলভিত্তিক আদত বা অভ্যাস। রাসুল (সা.) পাগড়ি পরেছিলেন এ কারণে যে, পাগড়ি পরিধান করা ছিল তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের অভ্যাসগত পোশাক। সে সময়ের আরব মুসলিম ও অমুসলিম সকলে পাগড়ি পরত। তবে রাসুল পাগড়ি পরতেন বলেই এটা সুন্নাত। আমাদের প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, মাথা ও চুল রক্ষায় শিখসমাজ পাগড়ি পরে। তবে বাস্তবতায় পাগড়ির ব্যবহার অনেক ব্যাপক। এমনকি এটা লিঙ্গনিরপেক্ষ পোশাকও বটে।
পাগড়ি অনেক সংস্কৃতির জন্য পোশাকের একটি সাধারণ এবং ফ্যাশনেবল আইটেম। তবে শিখদের জন্য এটি বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে। শিখ নারীরাও চুন্নি বা দুপাট্টা নামে একটি লম্বা স্কার্ফ দিয়ে তাদের মাথা ঢেকে রাখে। অনেকে মনে করেন, গরমের দিনে পাগড়ি পরা অস্বস্তিকর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গরম আবহাওয়ায় পাগড়ি একটি সাধারণ পোশাক মাত্র। এটি পরিধানকারীকে এক্সপোজার এবং সূর্যের রশ্মি থেকে রক্ষা করে। তবে এটা পরিধানে একেবারেই গরম অনুভূত হবে না, ঠিক এমনটি নয়।
পাগড়ি এমন মস্তকাবরণ, যা লম্বা বিশেষ কাপড় দিয়ে মাথায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা হয়। পাগড়ি একটি ধর্মীয় আদেশ হিসেবেও কাজ করে। শিয়া মুসলিমদের মাঝে এমন প্রচলন রয়েছে, যারা পাগড়ি পরিধানকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বিবেচনা করে। পাগড়ি মুুসলিম সুফি পণ্ডিতদের ঐতিহ্যবাহী নিশানাও।
পাগড়ির উৎপত্তি মধ্যপ্রাচ্যে। মেসোপটেমিয়া, সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয়রাও পাগড়ি পরত। খ্রিস্টাব্দ ৪০০-৬০০ সময়কালে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর সৈন্যরা সেই অঞ্চলে ফ্যাকিওলিস নামে এক ধরনের পাগড়ি পরত। এছাড়া বেসামরিক বাইজেন্টাইন ব্যক্তিরাও পাগড়ি ব্যবহার করত। শিয়া পণ্ডিতরা সাদা পাগড়ি পরেন, যদি না তারা নবীজির বংশধর বা সাইয়্যেদ হন। সাইয়েদ হলে সে ক্ষেত্রে তারা কালো পাগড়ি পরেন। অনেক মুসলিম পুরুষ সবুজ পাগড়ি পরতে পছন্দ করেন। কারণ তা জান্নাতের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশেষ করে সুফিবাদের অনুসারীদের মধ্যে এই রঙের পাগড়ি পরার প্রবণতা রয়েছে। উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশে সাধারণ নীল রঙের পাগড়ি পরিধানকারী নিজেকে উপজাতি হিসেবে নির্দেশ করতে পারে।
পাগড়ি সাধারণত পূর্ব আফ্রিকায় মুসলিম ধর্মগুরু ও ইথিওপীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা পরিধান করেন। এটি সাধারণত ম্যাকাউইস (সারং) বা জেলবিয়ার সাথে পরা হয়। ওমানে আরবি ইমামার ঐতিহ্য এখনো শক্তিশালী এবং এটি সে দেশের পোশাকের অন্তর্ভুক্ত। সুদান ও আরব উপদ্বীপের কিছু অংশে গাবানাহ নামে একটি রঙিন পাগড়ি প্রচলিত আছে। হিজাজ অঞ্চলে এটি সাধারণ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি সাংস্কৃতিক পাগড়ি এবং এটি এখনো মক্কা, মদিনা এবং জেদ্দার বাসিন্দাদের পোশাকের অংশ। ফিলিস্তিনে কেফিয়াহ নামে একধরনের মস্তকাবরণের প্রচলন আছে এটি এখন ফিলিস্তিনের জাতীয় প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং এর ব্যবহার আরব অঞ্চল অতিক্রম করে সারাবিশ্বে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠছে। পাগড়ি আফগানিস্তানের জাতীয় পোশাকের অন্তর্গত। এখানে স্থানীয়ভাবে পাগড়িকে লুঙ্গি বলা হয়।
বাংলাদেশে পাগড়ি পাগড়ি নামেই পরিচিত। চট্টগ্রাম ও সিলেটে ফাগরি বলা হয়। বাংলাদেশে পাগড়ির সবচেয়ে সাধারণ রং হলো সাদা। বাংলাদেশের প্রায় সকল কওমি মাদরাসায় বিভিন্ন স্তরের সমাপনী শিক্ষার্থীদের সম্মানসূচক পাগড়ি দেওয়া হয়। মায়ানমারে পাগড়িকে গাউং বাউং বলা হয় এবং এটিকে বেশ কিছু আঞ্চলিক শৈলীতে পরা হয়। মালয়েশিয়ায় নির্দিষ্ট মুসলিম আলেম এবং সার্বান শিখরা পাগড়ি পরে থাকেন। ভারতে পাগড়িকে সর্বত্র সম্মান এবং সম্মানের প্রতীক হিসেবে পরিধান করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের একটি পাগড়ি পরার প্রস্তাব দিয়ে সম্মান করা একটি সাধারণ রেওয়াজ।
ইন্দোনেশিয়ায় পুরুষদের পাগড়িকে ইকেট বলা হয়। এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘বেঁধে দেওয়া’। জাভার অন্যান্য অংশে ব্যবহারের জন্য ইকেট স্থির-আকৃতির কলগিতে বিকশিত হয়েছে, যাকে সেন্ট্রাল জাভাতে ব্লাংকন এবং জাকার্তা ও পশ্চিম জাভাতে বেন্ডো বলা হয়। পূর্ব জাভা ও বালিতে কলগি এখনো ঐতিহ্যগত উপায়ে তৈরি করা হয় এবং একে উডেং বলা হয়।
নেপালে পাগড়ি সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় পুরুষরা পরিধান করে। গ্রামীণ পাগড়িকে বলা হয় পগদি বা ফেটা। পাগড়িকে পাকিস্তানি পাঞ্জাবিরা পাগরি বা পাগ বলে এবং পশতুন ও সিন্ধিরা একে পাটকে বা পাটকো বলে। ব্রিটেনে ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পুরুষ ও মহিলা উভয় পাগড়ি পরিধান করে আসছে। কবি আলেকজান্ডার পোপকে মাঝে মাঝে পাগড়ি পরিহিত চিত্রিত করা হয়। দেশটিতে পাগড়ি মূলত পশ্চিম ভারতীয় বংশোদ্ভূত কারিনাস মহিলারা পরে থাকেন। গ্রিসে বিশেষ করে ক্রিট দ্বীপে পুরুষরা ঐতিহ্যগতভাবে একটি পাগড়ি পরিধান করেন, যা সারিকি নামে পরিচিত। সারিকি পাগড়ির তুর্কি প্রতিশব্দ। এছাড়া ফিজি, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, আর্মেনিয়া প্রভৃতি দেশে পাগড়ির প্রচলন রয়েছে।
হিন্দুধর্মে অনেক রাজপুত সাংস্কৃতিক কারণে এটি পরিধান করে। রাজস্থানের গুর্জররাও পরিধান করে। রাস্তাফারি আন্দোলনের বোবো আশান্তি ম্যানশনের সদস্যরাও মাথায় পাগড়ি পরে।
পাগড়ি পরিধান করা সুন্নত। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন তার মাথায় কালো পাগড়ি ছিল। তবে তিনি সাদা রঙের পাগড়ি বেশি পরতেন। তিনি হলুদ রঙের পাগড়িও পরেছেন।
বসন্তকালে রাজস্থানিরা সাদা ও লাল রঙের পাগড়ি পরেন, যাকে বলা হয় ‘ফাল্গুনিয়া’ আর বর্ষাকালে তারা পরেন রঙিন ঢেউ খেলানো পাগড়ি। এই পাগড়িকে বলা হয় ‘লহরিয়া’। রাজস্থানীরা শুভ ও আনন্দময় অনুষ্ঠানে রঙিন, দামি সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি সৌন্দর্যমণ্ডিত পাগড়ি পরিধান করে থাকেন। তারা অনেক সময় এধরনের পাগড়িতে রঙিন চুনরি ব্যবহার করেন। তবে, দুঃখ বা শোকের অনুষ্ঠানে সাদা-কালো রঙের পাগড়ি পরাই এসব এলাকার রীতি।