স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
গত ২৬ বছরেও সাহসী সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যাকারীরা শনাক্ত হয়নি।
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম পাঁচ বছর মামলার কার্যক্রম চললেও গত ২১ বছর ধরে তা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আইনের মারপ্যাঁচে মামলাটি উচ্চ আদালতে আটকে গেছে।
প্রথিতযশা এই সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ডের বিচার না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশার মধ্যে দিয়ে বৃহস্পতিবার ২৬তম বার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছেন সাংবাদিক ও নিহতের স্বজনেরা।
সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে জনকণ্ঠ যশোর অফিসে কর্মরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, শামছুর রহমান খুন হওয়ার পর ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ এই মামলায় ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।
অভিযোগ রয়েছে, মামলাটি নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়। ফলে পাঁচ সাংবাদিককে মামলাটিতে আসামি করেছিল তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। এসব সাংবাদিকদের কেউ কেউ সে সময় নির্যাতন ও কারাবাস করতে হয়। এর পর সরকার বদল হলে মামলাটিতে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ফারাজী আজমল হোসেন নামে আরেক সাংবাদিককে, যিনি শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দেশ ছাড়েন।
এতে একদিকে মামলার বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়; অন্যদিকে দুর্বল হয়ে যায় চার্জশিট। ২০০৫ সালের জুন মাসে যশোরের স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলার চার্জ গঠন হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে মামলাটি খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় মামলার বাদী সাংবাদিক শামছুর রহমানের সহধর্মিণী সেলিনা আকতার লাকি বিচারিক আদালত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আপিল করেন।
আপিল আবেদনে তিনি বলেন, মামলার অন্যতম আসামি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী হীরক পলাতক। হীরকসহ মামলার বেশ কয়েক আসামির সাথে খুলনার সন্ত্রাসীদের সখ্য রয়েছে। ফলে তার (বাদীর) পক্ষে খুলনায় গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বাদীর এই আপিল আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ‘মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না’ মর্মে সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করেন।
এদিকে, মামলায় বর্ধিত তদন্তে সংযুক্ত আসামি ফারাজী আজমল হোসেনও উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন। উচ্চ আদালতে রিটের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সরকার উদ্যোগ নিয়ে উচ্চ আদালতে বাদীর আপিল এবং ফারাজী আজমল হোসেনের রিট নিস্পত্তি করলে নিম্ন আদালতে এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা না এলে নিম্ন আদালতে এই মামলার কোনো কার্যক্রমই পরিচালনা করা যাবে না।
উচ্চ আদালতের নির্দেশের কারণে শামছুর রহমান হত্যা মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে আছে উল্লেখ করে যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু জানান, উচ্চ আদালতে আপিলের নিষ্পত্তি হলে খুলনার দ্রুত বিচার আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।
নিহতের সহোদর ও যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজেদ রহমান জানান, বহুবার সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে শামছুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য দাবি তোলা হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হীরক পুলিশের খাতায় পলাতক। আরেক আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার আসাদুজ্জামান লিটু র্যাবের ক্রসফায়ারে, কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন কালু হৃদরোগে এবং যশোর সদরের চুড়ামনকাটির আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় মারা গেছেন। অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন। দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও সাংবাদিক সমাজেও ক্ষোভ রয়েছে। একইভাবে ক্ষোভ রয়েছে ‘রাজনৈতিক কারণে’ মামলার আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সাংবাদিকদেরও। তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে একজন মারা গেছেন।
কর্মসূচি
শামছুর রহমানের ২৬তম হত্যাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
প্রেসক্লাব যশোর, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নসহ অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরা এদিন সকালে প্রেসক্লাবে জমায়েত হয়ে কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। এরপর শোকর্যালি করে শহীদের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবেন।
পরে প্রেসক্লাবের আয়োজনে দোয়া মাহফিল এবং যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের আয়োজনে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে।