খানির গবেষণা
এক দিন না খেয়ে কাটাতে হয়েছে ৫২.২ শতাংশ পরিবারকে
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ৭৪.৯ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের (খানি) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর ৪১.১১ শতাংশ আবাদি কৃষিজমি হারিয়েছে। চরম খাদ্যসংকটের কারণে এসব পরিবারের ৫২.২ শতাংশ মানুষকে পুরো এক দিন না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। অথচ সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় এসেছে মাত্র ৭.৫ শতাংশ পরিবার।
‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১’ গ্রহণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এর অঙ্গীকার ও সুফল বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনে কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি। ফলে এসব পরিবার নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিয়মিত কর্মসংস্থান ও সরকারি সামাজিক সুরক্ষা ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরার রয়েল গ্লাস কনভেনশন হলরুমে আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় সংলাপে এসব তথ্য ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
‘সহনশীলতার সূচনা নিজের ঘর থেকেই’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) এবং উন্নয়ন সংগঠন স্বদেশ।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খানির বিভাগীয় প্রতিনিধি। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি সাতক্ষীরা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে সাতক্ষীরা শহরে এসে বস্তিতে বসবাস করছেন। বাস্তুচ্যুতির পর খাদ্যসংকটকে তারা শুধু দুর্যোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন।
তাদের ভাষায়, ‘বাস্তুচ্যুতির পরবর্তী খাদ্য অনিরাপত্তা কোনো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনের একটি প্রতিরোধযোগ্য ব্যর্থতা।’
সংলাপে সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বস্তিতে বসবাসকারী যারা এখনো বয়স্ক বা বিধবা ভাতার আওতায় আসেননি, তাদের তালিকা দেওয়া হলে দ্রুত ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
এ ছাড়া পৌরসভার বাইরের ভূমিহীন পরিবারগুলো আবেদন করলে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি পরিবারকে সর্বোচ্চ দুই একর পর্যন্ত কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।
উন্নয়ন সংগঠন স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্তের সভাপতিত্বে সংলাপটি সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট উন্নয়ন গবেষক ও সিইপিআরের নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ নন্দী।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান, সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হযরত আলী এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী জাহিদ পারভেজ।
সংলাপে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল হামিদ, ডেইলি স্টারের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি, দক্ষিণের মশাল-এর সম্পাদক আশেক এ ইলাহী, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মমতাজ আহমেদ বাপী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান ও মিজানুর রহমান, সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা কিশোরী মোহন সরকার, নাগরিক নেতা আলী নুর খান বাবুল, এখন টেলিভিশনের আহসান রাজীব, বাংলা ট্রিবিউনের আসাদুজ্জামান সরদার এবং ভোরের বাণীর মোকাররাম বিল্লাহ ইমন।
এ ছাড়া স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নেন।