বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক
বাংলাদেশে মানব পাচার একটি গুরুতর সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক অপরাধ হিসেবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নানা উদ্যোগ এবং বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি পালনের পরও এই সমস্যা পরিপূর্ণভাবে সমাধান হচ্ছে না। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ঋণগ্রস্ততা, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, অনিরাপদ অভিবাসন, পারিবারিক সহিংসতা এবং দুর্যোগ বা জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি মানুষের মধ্যে মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। যারা পাচারের পর উদ্ধার হয়ে ফিরে আসছেন তারাও সঠিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সমন্বিত কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করার বিকল্প নেই।
বর্তমানে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সুযোগ নিয়ে অপরাধের বিস্তার ঘটাতেও পাচারের শিকার মানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে মানব পাচারের কৌশলও বদলে ফেলা হয়েছে। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় থাকা মানুষকে ফাঁদে ফেলতে পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া চাকরি, উচ্চ বেতন, বিদেশে কর্মসংস্থান কিংবা সম্পর্কের প্রলোভন নিয়ে হাজির হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে পাচারের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চাকরির কথা বলে নিয়ে গিয়ে সেখানে আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণা, রোমান্স স্ক্যাম, বিনিয়োগ প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধে বাধ্য করার ঘটনা ঘটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তিও প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। অনেক বাংলাদেশিকে যুদ্ধক্ষেত্রে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে পাচারের পর অনেককে রণক্ষেত্রে যুুদ্ধ করতে পাঠিয়ে দেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের দরিদ্র পরিবারের সদস্য, নারী ও শিশু, বেকার বা স্বল্পশিক্ষিত তরুণ, মৌসুমি শ্রমিক, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, অনিয়মিত অভিবাসনের পথে থাকা ব্যক্তি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানব পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি এবং অবৈধ দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীলতাও পাচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশের ভেতরে এবং ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচারের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে শ্রম পাচারের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরা, মাগুরা, ঝিনাইদহ, খুলনা, মেহেরপুর, বাগেরহাট, পিরোজপুর ইত্যাদি এলাকার মানুষকে ইটালি বা অন্য দেশে পাঠানোর নামে আফ্রিকান রাষ্ট্র লিবিয়াতে পাচারের তথ্য বেশ আলোচিত।
পাচারকারীরা সাধারণত ভুয়া চাকরি, অতিরিক্ত বেতনের প্রতিশ্রুতি, জাল নিয়োগপত্র, ঋণের ফাঁদ, বিয়ে বা সম্পর্কের প্রলোভন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে ফাঁদে ফেলে। বিদেশে নেওয়ার পর পাসপোর্ট জব্দ, বেতন না দেওয়া, ঋণের বোঝা, ভয়ভীতি, নির্যাতন ও চলাচলে বাধা দিয়ে ভুক্তভোগীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম, বেতনবঞ্চনা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক কলঙ্ক এবং পুনরায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়। অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে পাচারের শিকার ব্যক্তিরা নিজেরাই প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য হলেও তাদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি রয়েছে।
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন সংশোধন করে আরও সময়োপযোগী করা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন আইনের নাম হয়েছে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬’। এই আইনের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো, শুধু ‘মানব পাচার’ নয়, এর সাথে ‘অভিবাসী চোরাচালান’ বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে, সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান বহাল রাখা, অভিবাসী চোরাচালানের বিষয়টিকে প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং এর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত রাখা হয়েছে।
একইসাথে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করা এবং শোষণের উদ্দেশ্যে দত্তক নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক অভিবাসন প্রতারণা এবং ভুয়া বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপনের জন্য তিন থেকে সাত বছর কারাদণ্ড, যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে আনা বা স্থানান্তর করার শাস্তি তিন থেকে দশ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, পাচারকারীদের সহায়তা করা (যেমন সম্পত্তি প্রদান বা দলিল গোপন করা) তিন থেকে সাত বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী বা সাক্ষীদের হুমকি দিলে তিন থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, জোরপূর্বক আদালতের বাইরে আপস করাতে বাধ্য করলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে বা অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ভুক্তভোগীদের এ আইনে অপরাধী হিসেবে গণ্য না করা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তারা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ক্ষমতা পাবেন (ব্যাংক হিসাব জব্দ ও সম্পদ যাচাই)। মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল একযোগে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধ যেমন মাদক পাচার, সহিংসতা বা আঘাতের বিচারও করতে পারবেন।
মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে নতুন এই আইনের যথাযথ ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এবং বিশেষায়িত মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণে সরকারি নির্দেশিকা ও জাতীয় রেফারেল মেকানিজমও যথোপযুক্তভাবে কাজ করতে পারলে সুফল পাওয়া সম্ভব।
সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, রাইটস যশোরসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলো উদ্ধার, আশ্রয়, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক সেবা, পুনর্বাসন, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কাজ করছে।
দেশি-বিদেশি সংস্থা যত বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক না কেন মানব পাচার প্রতিরোধে প্রধান দায়িত্বটি পালন করতে হবে সরকারকেই। বিশেষ করে ত্রি-স্তর বিশিষ্ট সিটিসি-কে আরও সক্রিয় ও কার্যকর করা, নতুন আইনের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এই আইন সম্পর্কে পুলিশ, বিজিবি ও প্রসিকিউশনের অন্যান্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলেই মনে হয়। অতীতে এসব কাজের কথা বলা হলেও তার সফল বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায়নি। বেসরকারি উদ্যোগে যতটা সম্ভব এসব কাজ করা হলেও সরকারি পর্যায়ে তার আয়োজন ছিল না বললেই চলে।
একইসাথে মানব পাচার প্রতিরোধে অনলাইন নিয়োগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তে সাইবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিদেশগামী কর্মীদের চাকরি, নিয়োগদাতা ও চুক্তির তথ্য যাচাই আরও কঠোর করতে ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারকে সক্রিয় করা যেতে পারে। সীমান্ত ও বিমানবন্দরে সম্ভাব্য ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং দ্রুত সহায়তায় রেফার করার ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য ‘থোক বরাদ্দ’ না রেখে ‘নিড বেজড করা যেতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে পাচারের বিষয়ে জনসচেতনতা, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত বাড়াতে হবে। পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও পুনরায় পাচার প্রতিরোধ নিশ্চিত করা জরুরি; যা সহযোগিতা, সমন্বয় এবং কার্যকর রেফারেল ম্যাকানিজম শক্তিশালী করার মাধ্যমেই সম্ভব।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, রাইটস যশোর