যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ছাপা পত্রিকার বিবর্তন, প্রযুক্তির বিপ্লব ও মননশীলতার সংকট

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
ছাপা পত্রিকার বিবর্তন, প্রযুক্তির বিপ্লব ও মননশীলতার সংকট

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতিতে সংবাদপাঠের অভ্যাস বদলেছে, বদলেছে সংবাদ গ্রহণের সময় ও মাধ্যম। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠাভ্যাস ও সাহিত্যচর্চার কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

একসময় কাকডাকা ভোরে ছাপা পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতাম। সংবাদপত্র হাতে পাওয়ার মধ্যে ছিল অন্য রকম এক আনন্দ, এক ধরনের আবেগ। পত্রিকার পাতায় নিজের লেখা প্রকাশিত হয়েছে কি না, কিংবা সহকর্মী, সতীর্থ ও পরিচিত লেখকদের কোনো লেখা ছাপা হয়েছে কি না—তা দেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। সংবাদ পড়ার পাশাপাশি সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, সাহিত্যপাতা, ফিচার ও মতামতধর্মী লেখার প্রতিও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে দিনের শুরু হতো। এরপর নিশ্চিন্তে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া—সেটিও ছিল সেই সময়ের পরিচিত অভ্যাস।

সময়ের ব্যবধানে সেই অভ্যাসে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এখন আর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ঘুমাতে যাওয়ার আগেই স্মার্টফোনের পর্দায় দেখে নেওয়া যায় দেশের কোথায় কী ঘটেছে, কোন সংবাদটি আলোচনায় এসেছে, কোথায় কী নতুন ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপাঠের সকাল এখন অনেকের কাছে গভীর রাতের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করার সময়টুকুও যেন প্রযুক্তি আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।

এটি নিঃসন্দেহে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির এক বৈপ্লবিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের বিপরীতে আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠাভ্যাস ও সাহিত্যচর্চায় কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই হিসাব কি আমরা কখনো করেছি?

সংবাদপাঠের অভ্যাস বদলেছে, পাঠসংস্কৃতি কি এগিয়েছে

ডিজিটাল মাধ্যম সংবাদকে করেছে দ্রুতলভ্য। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেশ-বিদেশের খবর জানা যাচ্ছে। একই সংবাদ একাধিক উৎস থেকে যাচাই করার সুযোগও সহজ হয়েছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল সংস্করণ সংবাদপাঠকে আরও সহজ করেছে। সংবাদপত্রের প্রকাশনা ও বিতরণব্যবস্থায় যে সময় লাগতো, ডিজিটাল মাধ্যমে তার প্রয়োজন নেই। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু সংবাদ সহজলভ্য হওয়া আর প্রকৃত অর্থে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠা এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিরোনাম পড়ে, কয়েক লাইনের সংবাদ দেখে কিংবা ভিডিওর সংক্ষিপ্ত বিবরণ জেনে আমরা অনেক সময় মনে করি, দিনের গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো জানা হয়ে গেছে। অথচ একটি ঘটনার পেছনের ইতিহাস, সামাজিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য যে মনোযোগ ও সময় দরকার, তা ক্রমেই কমে আসছে।

প্রযুক্তি আমাদের দ্রুত তথ্য দিচ্ছে, কিন্তু সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ করে জ্ঞান অর্জনের অভ্যাস কি সমানতালে বাড়ছে? সংবাদ জানা আর সংবাদ বোঝার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি অনুধাবন করা জরুরি।

ছাপা পত্রিকা: সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চারও ক্ষেত্র

প্রিন্ট মিডিয়া বা ছাপা পত্রিকা শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল মানুষের মতপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশেষ করে সাহিত্যপাতা, সাময়িকী, সাপ্তাহিক সাহিত্য আয়োজন, ছোটদের পাতা এবং পাঠকের চিঠি নতুন লেখকদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতো।

অনেক লেখকের সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়েছে পত্রিকার পাতায় লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। কোনো তরুণ লেখকের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ কিংবা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা প্রকাশিত হলে তা শুধু তার ব্যক্তিগত আনন্দের কারণ হতো না; বরং লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতো। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা পড়ে নতুন লেখকেরা ভাষা, উপস্থাপনা, যুক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেতেন।

পত্রিকার সাহিত্যপাতা ছিল এক অর্থে লেখক তৈরির পাঠশালা। সেখানে একজন লেখক নিজের লেখার মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছাতেন, পাঠকের প্রতিক্রিয়া পেতেন এবং অন্য লেখকদের সঙ্গে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ গড়ে তুলতেন।

আজও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে সাহিত্যচর্চার সুযোগ রয়েছে। বরং ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে অনেক লেখক সহজে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। তবে অনলাইনে প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে বলেই যে সাহিত্যচর্চার সামগ্রিক মান ও গভীরতা বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দ্রুত প্রকাশ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও বেশি পাঠক পাওয়ার প্রতিযোগিতার মধ্যে সম্পাদনা, ভাষার শুদ্ধতা, যুক্তির গভীরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব যেন হারিয়ে না যায়।

শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠাভ্যাসের প্রতিফলন কোথায়

একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার মান কেবল পরীক্ষার ফলাফল কিংবা সনদের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কতটা পড়ছে, কতটা চিন্তা করছে, যুক্তি দিয়ে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারছে কি না এবং নিজের ভাষায় মত প্রকাশ করতে পারছে কি না—এসবও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

সংবাদপত্র হতে পারে শ্রেণিকক্ষের বাইরের একটি কার্যকর শিক্ষাসঙ্গী। নিয়মিত সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় পড়লে শিক্ষার্থীরা সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে ধারণা পায়, নতুন শব্দ শেখে, ভাষার ব্যবহার বোঝে এবং যুক্তিনির্ভর লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়। বিজ্ঞান, পরিবেশ, অর্থনীতি, খেলাধুলা, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক প্রতিবেদন তাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগৎকে জানতে সাহায্য করে।

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সংবাদপাঠ ও বিশ্লেষণী পাঠাভ্যাসকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? শিক্ষার্থীরা কি নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে? তারা কি একটি সংবাদ ও একটি মতামতধর্মী লেখার পার্থক্য বুঝতে শেখে? বিপরীত মতের দুটি লেখা পড়ে যুক্তি যাচাই করার সুযোগ পায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। কারণ পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত বিষয়বস্তু আয়ত্ত করা শিক্ষার একটি অংশমাত্র। বাস্তব জীবনকে বুঝতে, সমাজ সম্পর্কে সচেতন হতে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বহুমাত্রিক পাঠাভ্যাসের বিকল্প নেই।

এ ক্ষেত্রে ছাপা পত্রিকাই একমাত্র মাধ্যম হতে হবে, এমন নয়। নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমও সমানভাবে কাজে আসতে পারে। মূল কথা হলো, মাধ্যমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পড়ার অভ্যাস, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা এবং পড়া বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার সক্ষমতা।

পরিবর্তনটি কি কেবল মাধ্যমের, নাকি মননেও

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমাদের হাতে স্মার্টফোন আছে, ইন্টারনেট আছে, অসংখ্য সংবাদমাধ্যম আছে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্যের মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, ধৈর্য নিয়ে পড়ার অভ্যাস এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তা ভেবে দেখা দরকার।

আগে ছাপা পত্রিকার একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন কিংবা সম্পাদকীয় পড়তে পাঠককে কিছুটা সময় দিতে হতো। একটি লেখা শেষ করে তার বক্তব্য নিয়ে ভাবার সুযোগ ছিল। এখন ডিজিটাল মাধ্যমে একই লেখা পড়ার সুযোগ থাকলেও পাশাপাশি অসংখ্য বিজ্ঞাপন, ভিডিও, বিনোদনমূলক পোস্ট ও অন্যান্য তথ্য মনোযোগকে বারবার বিচ্ছিন্ন করে।

তবে সমস্যাটিকে শুধু প্রযুক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রযুক্তি নিজে পাঠাভ্যাস নষ্ট করে না; বরং প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল মাধ্যমকে যদি কেবল দ্রুত খবর দেখা ও বিনোদনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে তার সম্ভাবনার বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যাবে। আবার এই মাধ্যমেই যদি বই পড়ি, দীর্ঘ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করি, সাহিত্যচর্চা করি এবং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিই, তাহলে প্রযুক্তি আমাদের মননশীলতার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

করণীয় কী

প্রথমত, পরিবারে শিশুদের বই ও সংবাদপত্র পড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ছাপা পত্রিকা হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হলে ভালো, আর তা সম্ভব না হলে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সংস্করণ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সংবাদপাঠ, সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ, বিতর্ক, রচনা ও আলোচনা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। সপ্তাহে অন্তত একটি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ভাষায় মতামত লেখার সুযোগ দিলে তাদের ভাষা ও চিন্তার বিকাশ ঘটবে।

তৃতীয়ত, সংবাদমাধ্যমগুলোর সাহিত্যপাতা, পাঠকের চিঠি, তরুণ লেখকদের লেখা এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল রচনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা জরুরি। অনলাইন ও ছাপা—উভয় মাধ্যমেই মানসম্মত লেখা প্রকাশের সুযোগ বাড়াতে হবে। সম্পাদনা ও গঠনমূলক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন লেখকদের বিকাশে সহায়তা করা যেতে পারে।

চতুর্থত, পাঠাগার ও পাঠচক্রের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্য আলোচনা এবং সংবাদ বিশ্লেষণের আয়োজন করতে পারে। এতে পাঠাভ্যাস ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক চর্চায় পরিণত হবে।

সবশেষে, পাঠক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। শুধু শিরোনাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো সংবাদ পড়া, একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা এবং মতামতকে তথ্য থেকে আলাদা করে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

শেষ কথা

সময়ের সঙ্গে সংবাদপত্রের ধরন বদলাবে, সংবাদ গ্রহণের মাধ্যম বদলাবে, এমনকি পাঠকের অভ্যাসও বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। ছাপা পত্রিকার প্রতি নস্টালজিয়া দিয়ে প্রযুক্তির অগ্রগতিকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির অগ্রগতিকে শিক্ষা, সাহিত্য ও মননশীলতার বিকাশে কাজে লাগানো।

কাকডাকা ভোরে পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করার দিন শেষ। এখন ঘুমানোর আগে স্মার্টফোনে দেখে সবশেষ সংবাদ জানাই বাস্তবতা। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে মাধ্যম। কিন্তু যে প্রশ্নটি রয়ে গেছে, তা হলো, আমরা কি আগের চেয়ে বেশি জানছি, নাকি শুধু দ্রুত বেশি তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছি? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি শুধু তথ্য গ্রহণ করতে শিখছে, নাকি তথ্য বিশ্লেষণ, যুক্তি নির্মাণ ও সৃজনশীলভাবে ভাবতেও শিখছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে না পারলে প্রযুক্তির বিপ্লব আমাদের জীবনকে সহজ করলেও মননকে সমৃদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না।

কারণ, সংবাদপত্রের কাগজ বদলাতে পারে, সংবাদ পড়ার সময় বদলাতে পারে, কিন্তু একটি সচেতন ও মননশীল জাতি গঠনে পাঠাভ্যাস, সাহিত্যচর্চা এবং মুক্তচিন্তার গুরুত্ব কখনো বদলায় না।

লেখক: পেশাজীবী, সাবেক সংবাদকর্মী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)