সম্পাদকীয়
খেলাধুলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সুস্থ দেহ, সুন্দর মন, শৃঙ্খলাবোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। একটি দেশের ক্রীড়াঙ্গন সমৃদ্ধ হয় তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির মধ্য দিয়ে। আর এ ক্ষেত্রে খেলার মাঠের ভূমিকা অপরিসীম।
অথচ জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার সৌম্য সরকার ও মোস্তাফিজুর রহমানের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরির ‘আঁতুড়ঘর’ সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক খেলার মাঠটি অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই মাঠের এমন দুরবস্থা শুধু দুঃখজনক নয়, সাতক্ষীরার ক্রীড়া ঐতিহ্যের জন্যও উদ্বেগজনক।
একসময় যে মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল ও ভলিবলসহ বিভিন্ন খেলা দেখতে ছিল ক্রীড়াপ্রেমীদের পদচারণা, সেই মাঠেই খেলাধুলার পরিবেশ ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। মাঠের অসমতল ও উঁচু-নিচু ভূমি, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার অভাব এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার কারণে বছরের দীর্ঘ সময় এটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে থাকে। কাদাপানিতে ভরা মাঠে নিয়মিত অনুশীলন করা যেমন কঠিন, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের স্বাভাবিক খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠনগুলোর অনুশীলন, প্রতিযোগিতা ও নতুন খেলোয়াড় গড়ে তোলার কার্যক্রম।
এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায়ের একাধিক ক্রিকেটার উঠে এসেছেন, সেই মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ কেন নিশ্চিত করা গেল না? প্রতিভা বিকাশের জন্য শুধু ব্যক্তিগত আগ্রহ ও কঠোর পরিশ্রম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ। মাঠের অভাবে সম্ভাবনাময় তরুণেরা খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গেলে তার ক্ষতি শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তাদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সম্পৃক্ততার ওপরও। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের মাঠবিমুখতা যখন একটি বড় উদ্বেগের বিষয়, তখন বিদ্যমান মাঠটিকে অবহেলায় পড়ে থাকতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে একটি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠটিকে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের মাধ্যমে মিনি স্টেডিয়ামে রূপান্তরের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কেবল ড্রেন নির্মাণ কিংবা আবেদন জমা দেওয়াতেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাঠের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ভূমি সমতল করা, পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, মাঠের উপযোগী পৃষ্ঠ তৈরি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও দায়িত্ব বণ্টন জরুরি।
এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সংস্কারকাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার এবং কাজের মান তদারকির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। মাঠটিকে মিনি স্টেডিয়ামে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় টুর্নামেন্ট ও বিভিন্ন বয়সভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে নতুন প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি সাতক্ষীরার ক্রীড়াঙ্গনও প্রাণ ফিরে পাবে।
সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এই মাঠ কেবল একটি খোলা জায়গা নয়; এটি স্মৃতি, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক। সৌম্য সরকার ও মোস্তাফিজুর রহমানের মতো খেলোয়াড়দের উত্তরসূরি তৈরির পথ সুগম করতে হলে মাঠটির পুনরুজ্জীবন এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিশ্রুতিকে দ্রুত বাস্তব কাজে রূপ দেওয়া। ঐতিহ্যবাহী এই মাঠকে অবহেলার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে এনে নতুন প্রজন্মের খেলাধুলা ও স্বপ্ন দেখার উপযুক্ত প্রাঙ্গণ হিসেবে গড়ে তোলা হোক।