যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

উট সমাচার

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
উট সমাচার

পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজার প্রজাতির উট রয়েছে। শুনেছি রাজধানীর ঢাকার আরামবাগে জনৈক পীরের আশ্রমে নাকি উট রয়েছে। ওখানে যাইনি বলে দেখা হয়নি। তবে প্রথম উটের দেখা পেয়েছি ঢাকা চিড়িয়াখানায়। আর উটে চড়েছি মিসরে গিয়ে। উট মরুবান্ধব বলে এদেশে প্রাণীটির বিচরণ নেই।

ভারতীয় এক দোঁহাতে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘মারওয়ানের পুরুষ, জয়শলমীরের নারী, সিন্ধু দেশের ঘোড়া আর বিকানীয়ের উট— এদের জুড়ি নেই।’

বেদ ও জাতকে উটের কথা পাওয়া যায় না। তবে কোরআন-হাদিস, বাইবেল, লেবীয় পুস্তক, ঋগে¦দ, মনুসংহিতা, বুক অব জাজেস-এ উটের কথা রয়েছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও উট প্রসঙ্গ এসেছে। উট নিয়ে যিশুর বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে ‘ঈশ্বরের রাজ্যে ধনীর প্রবেশের চেয়ে সূঁচের গর্ত দিয়ে উটের যাতায়াত সহজ’।

পানি না পেলে কুঁজের চর্বি দিয়ে প্রয়োজন মেটায় উট। আর পানি পেলে একটি উট দশ মিনিটেই ৯০ লিটার শুষে নিতে পারে!

বাংলা সাহিত্যে উট নিয়ে খুব একটা মাতামাতি নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেদুইন হয়ে উটের দুধ খেতে চাইলেও জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় উটকে অশুভ প্রতীক হিসেবে এঁকেছেন:

‘এই কথা বলেছি তারে চাঁদ ডুবে চলে গেলে অদ্ভুত আঁধারে যেন তার জানালার ধারে উটের গ্রীবার মতো কোন এক নিস্তব্ধতা এসে।’

সংস্কৃত উষ্ট্র থেকে বাংলায় উট শব্দটি এসেছে। উষ্ট্র শব্দের মূল ‘উষ্’ ধাতু। এটার অর্থ ‘যে মরুতাপে দগ্ধ হলেও সূর্যতাপে পীড়িত হয় না’।

আর্য ও সেমিটিক জগতে উট শব্দটি অভিন্ন উৎস থেকে উদ্ভূত হতে পারে। কারণ সেমিটিক ভাষায় এটি ‘গামাল’, ফিনিসীয় ও হিব্রু ভাষায় এটি ‘গিমেল’। আরবিতে ‘জমল’।

আবার সংস্কৃত ‘উষ্ট্র’ শব্দের সঙ্গে ফারসি ‘উশতর’ ও প্রাচীন আবেস্তার ‘উসতর’ শব্দের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উশতর ও উসতর মানে উট।

‘মহামূর্খ’ কালিদাস নাকি উটের কল্যাণেই দেবতার বর পেয়ে মহাকবি হয়ে ওঠেন! গল্পটা এ রকম:

বিদূষী রাজকন্যার সঙ্গে তর্কে হেরে দিগগজ পণ্ডিতরা কৌশলে গজমূর্খ কালিদাসের সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে পড়িয়ে দেন। নতুন বর আসলে মূর্খ কি না তা বাজিয়ে দেখতে বাসরঘরে কালিদাসের সঙ্গে বিভিন্ন আলাপ জুড়ে দেন। এমন সময় রাজবাড়ির বাইরে কে যেন ডেকে উঠলো।

‘কো রৌতি’ মানে কী ডাকছে? রাজকুমারী জানতে চাইলেন।

‘উষ্টঃ’ -কালিদাসের জবাব।

‘কিমিতি কিমিতি’ মানে কী বললেন, কী বললেন—রাজকুমারীর উদ্বেগ।

আগে ভুল হয়েছে ভেবে কালিদাস এবার বললেন ‘উট্র’।

অর্থাৎ কালিদাস উষ্ট্র বলতে গিয়ে প্রথমে ‘র’ ফলা এবং পরে ‘ষ’ বাদ দিলেন।

মনের দুঃখে বিদূষী রাজকুমারী বলে উঠলেন ‘হায় বিধি রুষ্ট হলে কিনা করতে পারেন। আর তুষ্ট হলে কিনা দিতে পারেন। যে উষ্ট্র শব্দে একবার ‘র’ ফলা ও একবার ‘ষ’ লোপ করে, তার হাতেই কিনা পড়লো আমার মতো সুন্দরী।’

মহানবী (স.) রাতের বেলা উটে চড়েই মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে মুসলিম ছাড়া অন্যদের মাঝে উটের মাংসের তেমন প্রচলন নেই।

উটের কুঁজে পানি থাকে না। এখানে চর্বি জমে। তাই উট দীর্ঘদিন পানি না খেয়েও দিব্যি টিকে থাকতে পারে। এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার পেছনে জীবতাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে, একমাত্র উটেরই রয়েছে ডিম্বাকৃতি লাল লোহিতকণিকা। এই জাতীয় লোহিতকণিকাই উটকে মরুর প্রখর রোদের মাঝেও ১৬-১৭ দিন পানি ছাড়া টিকে থাকার শক্তি জোগায়। অবশ্য উট এই সময় স্বাভাবিক নিয়মে দেহের ওজন হারায়। এরাই আবার আট মিনিটের মধ্যে এক টানে ৪০ গ্যালন পানি পেটে ঢুকাতে পারে।

মুখের কোনো প্রকার ক্ষতি ছাড়াই উট মরুর কাঁটাযুক্ত গাছের পাতা খেতে পারে। গরু ছাগলের মতো এরাও জাবর কাটে। গাঠনিক কারণে এদের চামড়ায় সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়। আবার মরুর তাপ ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক বা আবরক (ইনসুলেশন) এদের চামড়ায় রয়েছে।

কোনো কারণে উট ক্ষেপে গেলে নিজের পেট থেকে বের করে আনা সবুজ রঙের ভয়াবহ বিশ্রী গন্ধের তরল পদার্থ মানুষ অথবা সজাতির প্রতি ছুঁড়ে মারে। এটা এক ধরনের রাসায়নিক বোমা। যে মানুষ এই বোমার অভিজ্ঞতা জীবনে এক বার নিতে পেরেছেন, তার পক্ষে সেই বিশ্রী অভিজ্ঞতা নাকি কোনোদিনও ভোলা সম্ভব হয় না।
আবার উটের বিষ্ঠা এতটাই শুকনো থাকে যে, এটাকে সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এর মূত্রও বেশ ঘন, সিরাপের মতো।

উট দৌড়াতে পারে না। হাঁটার গতি বাড়াতে পারে মাত্র। সাধারণত এরা মরুভূমিতে একদিনে শত মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে।

উট আর লামার সংকরায়ণ ঘটিয়ে এখন ‘কামা’ নামে এক প্রাণী উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ প্রাণীরও উটের মতো কুঁজ থাকে। থাকে ছোট কান ও লম্বা লেজ। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকান প্রাণী লামার মতো বিভক্ত খুর ও গায়ে বেজায় পশম হয়। ১৯৯৮ সালে দুবাইয়ের ক্যামেল রিপ্রোডাকশন সেন্টারে কৃত্রিম পন্থায় নিষিক্তকরণের মাধ্যমে ‘কামা’ তৈরি সম্ভব হয়। এরা উটের চেয়েও কষ্টসহিষ্ণু। মূলত মাংস ও উল আহরণ করতেই কামা তৈরি করা হয়েছে। উট যা খায়, এরাও তা খায়। তবে উটের মতো উগ্রমেজাজী নয়। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, উটের দুধ জমাট বাঁধে না। বিশ্বে উটের প্রথম ক্লোনিংও হয়েছে দুবাইয়ে। এটার নাম ‘ইনযাজ’।

এশিয়া ও আফ্রিকার লাখো মানুষ এখনও তাদের নানা ধরনের বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে উটের ওপরই নির্ভরশীল। বিশেষত মরুভূমিতে উট ছাড়া জীবনযাত্রাই অচল। মরুতে এই প্রাণীটি মানুষের খাদ্যেরও অন্যতম উৎস। এর চামড়া আর পশম নানা কাজে লাগে। হাড়গোড়ও ফেলনা নয়। বিষ্ঠাও জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

পাকিস্তান আমলে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি শীর্ষ দৈনিকের এক সংবাদে ছাপা হয়েছিল ‘ঢাকা থেকে একদল বয়স্ক উট জাম্বুরি উপলক্ষে করাচি যাচ্ছে।’ ‘বয়স্কাউট’ শব্দটির ‘া-কার’ চলে গিয়ে শব্দটি ফাঁক হবার কারণে বয়স্কাউট হয়ে যায় ‘বয়স্ক উট’।

আরবি ‘দিফয়ু’ শব্দের মূল অর্থ উটের লোম থেকে নির্মিত গরম কাপড় তবে ব্যবহরিক অর্থের দিক থেকে আরবিতে উটের দুধ, মাংস ও পোশাক-পরিচ্ছদও এই শব্দের আওতায় পড়ে।

এবার শুনুন উট নিয়ে মহাভারতের গল্পের এক চিলতে:

সত্যযুগে এক বনে ছিল এক মহাঅলস ও মহামূর্খ উট। মুনিদের দেখাদেখি সেও শুরু করলো কঠোর তপস্যা।

‘কী বর চাও?’—ব্রহ্মা একদিন খুশি হয়ে উটের কাছে জানতে চাইলেন।

‘প্রভু! আমার গলা একশ যোজন লম্বা করে দিন’—উটের আবদার।

‘তথাস্তু’ ব্রহ্মা জবাব দিলেন।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)