প্রযুক্তি
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
কার-টেকনোলজি বা গাড়িপ্রযুক্তি আজ এতোটাই আধুনিক হয়ে গেছে, বিস্ময় মানতে কারও দ্বিধা থাকে না। এটা গাড়িপ্রযুক্তির ইতিবাচক দিক। পাশাপাশি ওয়েবসাইটের মতো কারহ্যাকিংও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যত বেশি উন্নতমানের গাড়ি, তত বেশি গাড়িটি হ্যাকড হবার ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত গাড়িই কার হ্যাকারদের টার্গেট। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, দুর্বৃত্তরা চলন্ত গাড়ি হ্যাক করার চেষ্টা চালালে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
এক সময় হ্যাকারদের টার্গেট ছিল কম্পিউটার। তারপর তারা অন্যের মোবাইল ফোন হ্যাকিংয়ে নজর দেয়। এখন তাদের নজর গাড়ির ওপর। পিসি বা স্মার্টফোন হ্যাকড হলে প্রাইভেসির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু কার হ্যাকিংয়ের পরিণতি কী হতে পারে, তা এখনও নির্ণীত হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলন্ত কার হ্যাক করা হলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
কিন্তু হাই-টেক হ্যাকাররা বসে নেই। তাই পশ্চিমা বিশ্বে কার হ্যাকিং এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। লন্ডনে দুই টন ওজনের বিএমডবলিউ গাড়ি হ্যাকড হবার পর তা বেশ আলোচিত হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার-সিকিউরিটি গবেষকরা হাতে-কলমে দেখাতে পেরেছেন, সর্বশেষ গাড়ি প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও স্বয়ংক্রিয় পন্থায় চালু হওয়ার ডিভাইসও নিমিষে গাড়ির মালিকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তারা বলেছেন, ভিডিও গেম চালানোর সময় আমাদের পক্ষে যেমন করে গেমটির গতি বৃদ্ধি, গতি নিয়ন্ত্রণ ও স্টিয়ারিং ঘোরানো সম্ভব, তেমনি কার হ্যাকাররাও তাদের হ্যাক করা গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে এ কাজটি হাজার মাইল দূর থেকেও করা সম্ভব।
আধুনিক একটি গাড়িতে ৩০ বা তারও বেশি ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট বা ইসিইউ থাকে। এসব ইসিইউ হচ্ছে আধুনিক গাড়ির ‘ডিজিটাল ব্রেন’। আর এ ডিজিটাল ব্রেনের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রিত হয় স্টিয়ারিং ও ব্রেক সিস্টেমের মাধ্যমে। এসব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয় একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে যা সহজে হ্যাক করা যায়।
আবার আধুনিক গাড়িতে ব্লু-ট্রুথ আর ওয়াইফাইয়ের মতো ওয়্যারলেস টেকনোলজি এবং ফাইভজির মতো সেলুলার ডেটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এ তিনটি বিষয়ও সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ায়। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির অটোমোটিভ সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর স্টেফান সেভেজ বলেন, ‘গাড়িতে সাইবার হামলা মোটেও অবাস্তব নয়। আমরা নিজেরাও তা পরীক্ষা করে দেখেছি।’
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে এখনও পর্যন্ত হ্যাক-প্রুফ কম্পিউটার সিস্টেম আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু গাড়ি কোম্পানিগুলো হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, এটাও ভাবার কোনো কারণ নেই।
প্রযুক্তির অফুরান বিকাশ মূলত আধুনিক গাড়িকে বিশালাকার চলমান কম্পিউটার বানিয়ে ছেড়েছে। এই সকল গাড়িতে বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় ফিচার রয়েছে, যা হ্যাকিংয়ের পক্ষে সুবিধাজনক। তাই এই ধরনের হ্যাকিং থেকে নিজেদের গাড়িকে সুরক্ষিত রাখতে মেনে চলতে হবে কয়েকটি নিয়ম। যেমন, নিজেদের বাড়ির ঠিকানা জিপিএসে দেওয়া উচিত নয়। এটি ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু, এটি হ্যাকারদের সহজেই যে কোনো বাড়ি খুঁজে পেতে অনুমতি দেবে। একইভাবে হ্যাকাররা সেই গাড়ির সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারে। তাই বাড়ির ঠিকানা গাড়ির জিপিএসে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
সম্প্রতি দূর থেকে হ্যাক করে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়ার কৌশল প্রকাশ করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন যুক্তরাজ্যের উচ্চ আদালত। জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগনসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গবেষকেদের এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে যান।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্লাভিও গারসিয়া ও বারিস এজ এবং নেদারল্যান্ডসের গবেষক রোয়েল ভারডাল্ট মিলে গাড়ির ইমোবিলাইজেশন সিস্টেমকে হ্যাক করার কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতির নাম মেগামোস ক্রিপটো। এ পদ্ধতিতে গাড়ির চাবির সঙ্গে যুক্ত ট্রান্সপোডার বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে ব্ল্যাক হ্যাট সম্মেলনে গাড়ি হ্যাক করার এ কৌশলের বিষয়টি উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন তারা।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, গাড়ি হ্যাক করার কৌশল প্রকাশিত হলে তা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যেতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, এ গবেষণা জনস্বার্থে করা হয়েছিল। তবে, আদালতের রায়কে তারা শ্রদ্ধা করবেন।