শখের বশে বাড়ির উঠোনে মাত্র দুটি রঙিন মাছ দিয়ে শুরু। সেই ‘ছোট শখ’ই আট বছরের পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ে পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক উদ্যোগে। যশোরের কেশবপুর উপজেলার মাগুরখালি গ্রামের হাবিবুর রহমান গাজীর ছেলে তরুণ উদ্যোক্তা মো. আব্দুল্লাহ (২২) এখন বাড়ির উঠানে ৫৬টি হাউজ ও পুকুরে প্রায় ২২ প্রজাতির রঙিন মাছ চাষ ও প্রজনন করছেন। উৎপাদন করছেন লক্ষাধিক মাছের পোনা। অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব মাছ বিক্রি করে আয় করছেন তিনি।
প্রায় আট বছর আগে নিছক শখের বশে দুটি রঙিন মাছ সংগ্রহ করেছিলেন আব্দুল্লাহ। তখন ব্যবসা করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। শখের সেই দুটি মাছের পরিচর্যা ও প্রজননের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মাছের সংখ্যা। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির রঙিন মাছের প্রতিও তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে শখের গণ্ডি পেরিয়ে বড় পরিসরে মাছ চাষের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।
পরবর্তীতে নিজের আগ্রহ, শ্রম ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শখের রঙিন মাছ চাষকে বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আব্দুল্লাহ। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তিনি গড়ে তুলেছেন রঙিন মাছের একটি ছোট প্রকল্প।
আব্দুল্লাহর বাড়ির উঠোনজুড়ে থাকা ৫৬টি হাউজ ও পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির রঙিন মাছ চাষ ও প্রজনন করা হচ্ছে। প্রকল্পে রয়েছে ফাইটার ফিশ, গোল্ডফিশ, কইকাপ, কমেট, মিক্স গাপ্পি, ব্ল্যাক মন্টেল, ব্ল্যাক ননমন্টেল, ব্ল্যাক বেলুন মলি, হোয়াইট বেলুন মলি, রেডিয়াম হোয়াইট মলি, স্টেল, প্লাটি ও জেব্রাসহ প্রায় ২২ প্রজাতির রঙিন মাছ।
আব্দুল্লাহ জানান, বর্তমানে তার খামারে প্রায় লক্ষাধিক রঙিন মাছের পোনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব মাছের চাহিদা প্রচুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মাছের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছ পাঠিয়ে দেন।
আব্দুল্লাহ বলেন, ‘প্রায় আট বছর আগে শখ থেকে দুটি মাছ দিয়ে শুরু করেছিলাম। তখন ভাবিনি, এটি একদিন আমার আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠবে। ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা ও প্রজাতি বাড়তে থাকে। এখন এটিকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছি।’
স্থানীয়রা জানান, আব্দুল্লাহর উদ্যোগ ও সফলতা এলাকার অন্য তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করছে। একসময় অনেকের কাছেই রঙিন মাছ ছিল নিছক শখের বিষয়। তবে তার উদ্যোগ দেখে এখন কেউ কেউ এটিকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। তার সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে ইতোমধ্যে এলাকার প্রায় এক ডজন তরুণ রঙিন মাছ চাষ শুরু করেছেন।
আব্দুল্লাহর দেখাদেখি রঙিন মাছের চাষ শুরু করেছেন নতুন উদ্যোক্তা মাইনুদ্দিন হাচান জুনায়েদ। তিনি বলেন, অল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে রঙিন মাছের চাষ ও প্রজনন করা সম্ভব। বাড়ির আঙিনা কিংবা অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে তরুণদের কর্মসংস্থান ও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আব্দুল্লাহর উদ্যোগে তার পরিবারও সহযোগিতা করছে। মাছের পরিচর্যা, খাবার দেওয়া, পানি পরিবর্তন ও প্রজননের মতো কাজ নিয়মিত করতে হয়। পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের শ্রম-অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বেড়েছে তার মাছের প্রকল্পের পরিসর।
শখ থেকে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন আব্দুল্লাহর স্বপ্নের প্রকল্প। মাত্র দুটি মাছ দিয়ে শুরু করে লক্ষাধিক পোনা উৎপাদনের এই যাত্রা দেখিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে বাড়ির ছোট্ট উঠানও হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় আয়ের ক্ষেত্র। তার উদ্যোগ শুধু নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করেনি, আশপাশের তরুণদেরও শখকে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে রূপ দেওয়ার পথ দেখাচ্ছে।
কেশবপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস বলেন, ‘রঙিন মাছ চাষ অল্প জায়গায়ও করা সম্ভব এবং এর বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। বাড়ির আঙিনা বা অব্যবহৃত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে তরুণরা পরিকল্পিতভাবে রঙিন মাছের চাষ ও প্রজনন করলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আয়ও করতে পারেন। আব্দুল্লাহ শখ থেকে শুরু করে যেভাবে রঙিন মাছের চাষকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও অন্য তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ সব সময় দেওয়া হয়ে থাকে।’