রায়হান সিদ্দিক
, যশোর
সত্তরোর্ধ্ব মঞ্জিলা বেগম। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় প্রাপ্তির খাতাটা শূন্যই রয়ে গেছে তার। অভাবের সংসারে জন্ম, অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধে একাকী লড়াই, আর শেষ জীবনে এসে হারিয়েছেন উপার্জনক্ষম দুই সন্তানকে। সব হারিয়ে যখন চারদিকের অন্ধকার মঞ্জিলা বেগমকে গ্রাস করছিল ঠিক তখনই তার জীবনে আশার আলো হয়ে দেখা দেয় যশোরের ‘জয়তী সোসাইটি’। মঞ্জিলা বেগমের মতো এমন ৪০০ জন ভাগ্যাহত মায়ের জীবন নতুন করে রাঙিয়ে দিয়েছে জয়তী সোসাইটির ‘ষাটোর্ধ্ব নারীসেবা কর্মসূচি’।
মঞ্জিলা বেগম বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে জয়তী আমার খাওয়া দাওয়া-কাপড়ের দায়িত্ব নিয়েছে। মাঝে মাঝে পিকনিকে নিয়ে গিয়ে মাছ মাংস ভালো-মন্দ খাওয়ায়। এখন আমি অনেক খুশি। ছেলে দুডো মরার পর অসহায় হয়ে পড়িলাম। একটা মেয়ে আছে, জামাই নেই। পরের বাড়ি কাজ করে খায়। জয়তীর কারণে শেষ জীবনে এসে একটু সুখ পাচ্ছি।’
আরেক সুবিধাভোগী জয়বুন নেছা দীর্ঘ দশ বছর ‘ষাটোর্ধ্ব নারীসেবা কর্মসূচি’র আওতায় রয়েছেন। একসময় ছানি পড়ে চোখ অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল ৬৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার। জয়তী সোসাইটির নীবিড় পর্যবেক্ষণ আর স্বাস্থ্যসেবায় চোখের আলো ফিরে পেয়েছেন তিনি।
জয়বুন নেছা বলেন, ‘আমি খুবই অসহায় ছিলাম। ছানি পড়ে দুই চোখই প্রায় নষ্ট হয়ে গেছিলো। এমন কেউ ছিলো না যে আমাকে সহযোগিতা করবে। তখন জয়তী সোসাইটি আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। তিনটা অপারেশন হয়েছে, সব খরচ তারা করেছে। এখন আমি অনেক ভালো আছি।’
২০০২ সালে নারীদের অধিকার সচেতন ও স্বাবলম্বী করার প্রত্যয় নিয়ে জয়তী সোসাইটির যাত্রা শুরু। আর ‘বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বয়স্কদের জন্য নিরাপদ আনন্দ আশ্রম’ এই স্লোগান নিয়ে ২০০৮ সালে তারা শুরু করেন ‘ষাটোর্ধ্ব নারীসেবা কর্মসূচি’। সংস্থাটি বিশ্বাস করে, কোনো মা-বাবাই তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে প্রকৃত মানসিক শান্তি পান না। তাদের হৃদয়ের ব্যাকুলতা যেন গুমরে না কাঁদে, সেজন্যই মায়েদের আমৃত্যু সম্মানের সাথে নিজের পরিবারে রাখতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে মাত্র ১১৩ জন বৃদ্ধাকে নিয়ে কাজ শুরু হলেও বর্তমানে ৪০০ জন নারী এই কর্মসূচির সুশীতল ছায়ায় জীবন অতিবাহিত করছেন।
জয়তী সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির আওতায় মায়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য রয়েছে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা। সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি এখানে সপ্তাহে তিন দিন ফিজিওথেরাপি, মেডিটেশন ও কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি কোনো মা প্যারালাইসিস বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে কর্মীরা সরাসরি তার বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেন। এছাড়াও চোখের ছানি অপারেশনসহ জটিল চিকিৎসায় তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা ও পুষ্টি ভাতা প্রদানের পাশাপাশি পারিবারিক অবহেলার শিকার মায়েদের মানসিক শক্তি জোগাতে নিয়মিত মতবিনিময় সভা ও পারিবারিক কাউন্সিলিং করা হয়। ঈদ, পূজা ও মা দিবসের মতো বিশেষ দিনগুলোতে মায়েদের হাতে নতুন পোশাক ও মিষ্টি তুলে দেওয়া হয়।
এর বাইরে মায়েদের একঘেয়েমি কাটাতে বছরজুড়ে আয়োজিত হয় বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা। মাঝেমধ্যেই বসে গানের আসর। বার্ধক্যের সব জরা ভুলে মায়েরা সেখানে মেতে ওঠেন পুরনো দিনের লোকজ ও মরমি গানে। শুধু গান নয়, এই মায়েদের জন্য আয়োজন করা হয় বনভোজনেরর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাওয়া, খোলা আকাশের নিচে খেলাধূলা করা। সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া- এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মায়েদের হারানো শৈশব আর কৈশোরের আনন্দ ফিরিয়ে দেয়। এছাড়া সচ্ছল পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সেবায় দক্ষ কর্মী তৈরির প্রশিক্ষণও দিচ্ছে সংস্থাটি।
জয়তী সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক অর্চনা বিশ্বাস জানান, একজন মা তার নিজের বাড়িতেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করেন। আর সেই বাড়ির পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলতেই তারা কাজ করছেন। গান, পিকনিক আর আড্ডার মধ্য দিয়ে তারা মায়েদের বোঝাতে চান যে, বার্ধক্য মানেই শেষ নয়।
তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই না বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে মা-বাবা কষ্ট পাক। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই জয়তী সোসাইটি এই উদ্যোগ নিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমাদের মায়েরা শেষ জীবনে চলার জন্য কোনো সঞ্চয় রাখেন না। ফলে এই সময়টা তারা অসহায় হয়ে পড়েন। মায়েদের এই কষ্ট লাঘব করতে ২০০৮ সালে আমরা শুরু করি ‘ষাটোর্ধ্ব নারীসেবা কর্মসূচি’।”
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এই মানবিক কাজে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সম্পৃক্ত রয়েছেন। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকেও আমরা বিভিন্ন সময় এই মায়েদের জন্য সহযোগিতা পেয়ে থাকি। আর জয়তী সোসাইটির যে নিজস্ব ব্যবসা আছে তার একটি লভ্যাংশ দিয়েই চলছে এই কর্মসূচি।’
সমাজ ও পরিবারের অবহেলার শিকার মায়েদের কাছে জয়তী সোসাইটি আজ কেবল একটি সংগঠন নয়, বরং এক পরম নির্ভরতার নাম হয়ে উঠেছে।