যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সাইকোলজি

তেলে ভাসে নগর জনপদ

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : সোমবার, ২৫ মে,২০২৬, ০২:০০ পিএম
তেলে ভাসে নগর জনপদ

ভারতের এক বিদ্যাজীবী পরিবারের সফল উত্তরাধিকার হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (জš§ ৬ ডিসেম্বর ১৮৫৩; মৃত্যু ১৭ নভেম্বর ১৯৩১)। তাঁর প্রকৃত নাম শরৎনাথ ভট্টাচার্য। শৈশবে ‘হর’ বা শিবের প্রসাদে জটিল অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠায় নাম বদলে রাখা হয় হরপ্রসাদ। পরবর্তী সময়ে সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করায় ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পান। বাংলাসাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ‘চর্য্যাচর্য্য বিনিশ্চয়’ বা ‘চর্যাপদ’ ১৯০৭ সালে নেপাল থেকে হরপ্রসাদই আবিষ্কার করেন।

তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘তেল’ নিবন্ধের শুরুতেই লিখেছেন, ‘তৈল যে কী পদার্থ তাহা সংস্কৃত কবিরা কতক বুঝিয়াছিলেন, তাহাদের মতে তৈলের অপর নাম স্নেহ। বাস্তবিক স্নেহ ও তৈল একই পদার্থ। আমি তোমায় স্নেহ করি, তুমি আমায় স্নেহ কর, অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে তৈল দিয়া থাকি। স্নেহ কী? যাহা স্নিগ্ধ বা ঠান্ডা করে তাহার নাম স্নেহ। তৈলের ন্যায় ঠান্ডা করিতে আর কীসে পারে!’

কিন্তু সমাজ রূপান্তরের পরিক্রমায় ‘তেল’ শব্দটির প্রয়োগ নেতিবাচক অর্থে প্রচলিত হয়েছে। কেননা, মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনে যেখানে শক্তি-বিদ্যা-ধন-কৌশল প্রভৃতি কোনো কাজে আসে না, তখন ‘তেল’ বেশ কাজ দেয়। ‘তেল’ শব্দটির এখানে তাৎপর্যগত অর্থ দাঁড়ায় মিথ্যা প্রশংসা বা লোক দেখানো স্তুতি। তার মানে, স্নেহ বা শ্রদ্ধা তার চরিত্র হারিয়ে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করলে তা ‘তেল’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

শাস্ত্রীর ভাষায়, ‘বাস্তবিকই তেল সর্বশক্তিমান। ... যে সর্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান। তাহার কাছে জগতের সব কাজই সোজা, তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না- উকিলিতে প্রসার করিবার জন্য সময় নষ্ট করিতে হয় না, বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে হয় না, কোনো কাজেই শিক্ষানবিশ থাকিতে হয় না। যে তৈল দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসর হইতে পারে, আহাম্মক হইলেও ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারে, সাহস না থাকিলেও সেনাপতি হইতে পারে এবং দুর্লভরাম হইয়াও উড়িষ্যার গভর্নর হইতে পারে।’

তিনি লিখেছেন, ‘তেলের যে মূর্তিতে আমরা গুরুজনকে স্নিগ্ধ করি তাহার নাম ভক্তি, যাহাতে গৃহিণীকে স্নিগ্ধ করি তাহার নাম প্রণয়, যাহাতে প্রতিবেশীকে স্নিগ্ধ করি তাহার নাম মৈত্রী, যাহা দ্বারা জগৎকে স্নিগ্ধ করি তাহার নাম শিষ্টাচার ও সৌজন্য ‘ফিলিনথ্রপি’। যাহা দ্বারা সাহেবকে স্নিগ্ধ করি তাহার নাম লয়্যালটি, যাহা দ্বারা বড়লোককে স্নিগ্ধ করি তাহার নাম নম্রতা বা মডেস্টি। চাকর-বাকর প্রভৃতিকেও আমরা তেল দিয়া থাকি, তাহার পরিবর্তে ভক্তি বা যত্ন পাই। অনেকের কাছে তেল দিয়া তেল বাইর করি।’

চিকিৎসা-বিজ্ঞান বলে, বেশি তেল খাওয়া স্বাস্থ্যের করে ক্ষতি। আর অভিজ্ঞতা-বিজ্ঞান বলে, বেশি তেল মারা আনে সফলতা ও উন্নতি! বর্তমানে তেলবাজি ছাড়া সমাজ চলে না। রাষ্ট্র চলে না। যোগ্যতার তেমন কোনো মূল্য নেই। কে কত বেশি তেল দিতে পারেন তাই এখন যোগ্যতার মাপকাঠি। আমাদের দেশে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শাসকেরা তেলবাজিকে বড় বেশি মূল্য দেন। সামনে যেতে হলে একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে তেলবাজি। ব্যবসা, বাণিজ্য, নেতৃত্ব, পোস্টিং, প্রমোশন এসবই তেলবাজির বৃত্তে আটকে গেছে।

আসলে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি তেলবাজ। দক্ষতা আর কার্যকারিতার ঘাটতি থাকতে পারে। তাই বলে তেল-বিমুখ কেউই নই। স্রেফ তেলের দখল নেওয়ার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকা ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য তছনছ করে দিয়েছে।

বর্তমান জামানায় তেল ছাড়া সবকিছু অচল। তেল আছে তো সব আছে, তেল নেই তো কিছু নেই। তেল ছাড়া কোনো কাজ হয় না। ভাজি-ভর্তা-ঝোল, জ্বালা-জ্বলা-উত্তাপ আর উন্নতি-অগ্রগতি-পদোন্নতি- সবকিছু নির্ভর করে তেলের ওপর। তেল ছাড়া বাতি জ্বলে না, গাড়ি চলে না, বিমান ওড়ে না, উনুন জ্বলে না, জীবনও চলে না। তেল বেঁচে থাকবার অনিবার্য উপাদান, জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

সময়টাই এখন তেলের। চারদিকে শুধু তেল, তেল আর তেল। আমরা সবাই এখন একেকটি তেলের বিশাল বিশাল আধার। তেল মারতে মারতে একেক জনের গায়ের চামড়া তুলে ফেললেও আমরা ক্ষান্ত হই না। বর্তমানে তৈলবিদ্যা যে যত বেশি আয়ত্ত করতে পারি জীবনে সে ততটাই উন্নতি করি। আমরা বিশ্বাস করতে শিখে গেছি, তেলহীন বিদ্যা ফুটো পয়সার মতোই অচল। মনে রাখা উচিত, ‘এক তৈলে চাকাও ঘোরে, আরেক তৈলে মনও ফেরে।’

বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক ডায়োজেনেস রাজা ডেনেসের তোষামোদ করতেন না বলে তাকে খুব কষ্ট করে দিন কাটাতে হতো। অথচ অ্যারিস্টোপাস নামে আরেক দার্শনিক রাজাকে খুশি করে খুবই আরামে-আয়েশে ছিলেন। একদিন অ্যারিস্টোপাস ডায়োজেনেসকে শাক দিয়ে ভাত খেতে দেখে ঠাট্টা করে বললেন, ‘একটু তোষামোদি শিখলে তোমাকে শাক দিয়ে ভাত খেতে হতো না।’ ডায়োজেনেস উত্তরে বললেন, ‘আর তুমি যদি কষ্ট করে শাক দিয়ে ভাত খাওয়াটা শিখতে তাহলে তোমাকে অমন তোষামোদি করতে হতো না।’

মনে পড়ে, তেল দেওয়ার সাড়াজাগানো গল্পের মধ্যে আছে, ‘স্যার এই ইলিশ মাছটা আমার গ্রামের পুকুরের। তাই নিয়ে আসলাম।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)