সুবর্ণভূমি ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম ধরে রাখতে কৌশল পাল্টাচ্ছে ইরান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে দেশটি এখন নতুন কৌশলে হামলা চালাচ্ছে। ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে আসছে তেহরান।
ওয়াশিংটনের ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে তারা এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।
ইরানের ক্রমাগত হুমকি ও হামলার কারণে বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেশ চড়েছে। অবশ্য এর মধ্যেও কিছু জাহাজ ঝুঁকি নিয়েই এই জলপথ দিয়ে পারাপার হচ্ছে।
নিজেদের নতুন এই রণকৌশলের সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ইরানের ওই দুই কর্মকর্তা। তবে তাদের একজন উল্লেখ করেন, প্রায় দশ দিন আগে থেকেই ইরান তাদের বিধিনিষেধ অমান্যকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল ব্যবহার শুরু করেছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক দিনগুলোয় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন কৌশলের আওতায় হামলার ধরন ও গতি উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর এই পুরো তৎপরতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই কর্মকর্তার একজন বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো যে চেষ্টা চালাচ্ছে, মূলত সেটিকে নস্যাৎ করে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
নতুন এই কৌশলগত সিদ্ধান্তটি ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে পূর্ণ সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে।
নজরদারির জন্য ‘স্পটার’ ব্যবহার করছে ইরান
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস করে দেওয়ার পর ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) ছোট ছোট নৌকায় ‘স্পটার’ ব্যবহার শুরু করেছে। নৌকাগুলোয় কোনো অস্ত্র থাকে না। ওই কর্মকর্তা বলেন, এসব স্পটার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করছে, যার মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজও রয়েছে।
গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় মার্কিন সামরিক বাহিনী জানতে পারে, ইরানের কয়েকজন স্পটার একটি ‘ধাও’-এ অবস্থান করে আইআরজিসিকে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছিলেন। এ ঘটনার কথা আগে প্রকাশ্যে আসেনি।
‘ধাও’ হলো আরব সাগর, পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী কাঠের পালতোলা ছোট নৌকা। সাধারণত মাছ ধরা, পণ্য পরিবহন বা উপকূলীয় চলাচলে এটি ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন বাহিনী পরে ওই নৌযানটির মুখোমুখি হয়ে সেটিতে থাকা লোকজনকে চলে যেতে বলে। এরপর নৌযানটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
ইরান যুদ্ধে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে ভাবছেন। তবে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে আর হামলা চালাবেন না।
সংঘাতের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নিজেদের নৌ অবরোধ জোরদার করছে এবং নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার আরও বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। হামলার আশঙ্কা, সঙ্গে জাহাজ চলাচল ও বিমার উচ্চ ব্যয় স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্বাধীনভাবে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রণালিটি দিয়ে চলাচল অব্যাহত রাখা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) পক্ষ থেকে জানানো ঘটনাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালির আশপাশে তেলবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ড্রোন হামলাও রয়েছে।
জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, হামলার এই হার ৩ থেকে ৫ অক্টোবরের সময়কার হামলার হারের প্রায় সমান। এ ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক এক সূত্র বলেন, ‘হামলার গতি বেড়েছে, যা দেখে মনে হচ্ছে এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হচ্ছে।’
বিস্তৃত এলাকাজুড়ে হামলা
কর্মকর্তারা বলেন, নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে তেহরান হরমুজ প্রণালির বাইরেও তাদের অভিযান পরিচালনার ভৌগোলিক পরিধি বাড়াবে। এর আওতায় ওমান উপসাগর এবং আরও দূরের জলসীমাও থাকবে।
ইউকেএমটিও এবং ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন কোম্পানিকে জানানো হামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, ইরান হয়তো এরই মধ্যে এই কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইরান হরমুজ প্রণালির বাইরের এলাকাতেও জাহাজকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এসব এলাকার মধ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলসংলগ্ন জলসীমাও রয়েছে।
দ্বিতীয় আরেকজন ইরানি কর্মকর্তা আরও বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে তেলের দাম কমাতে দেবে না তেহরান।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তারা যখনই ভাববে যে তারা তেলের দাম কমার পরিস্থিতির কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, ঠিক তখনই আমরা তাদের সেই অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে দেবো। এটা দাবার চালের মতো একটি খেলা।
‘এ ধরনের জাহাজ কোথাও নিরাপদ থাকবে না, এমনকি হরমুজ প্রণালির বাইরেও নয়।’
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য করা অনুরোধে পেন্টাগন ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
‘শিগগিরই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে’
দুই ইরানি কর্মকর্তাই বলেন, তেহরান এমন একটি পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে তাদের আরোপিত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে কোনো জাহাজই প্রণালিটি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।
কর্মকর্তাদের একজন বলেন, ‘শিগগিরই এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
গত রোববার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি এখনো ‘তীব্র’ পর্যায়ে রয়েছে। এটি ঝুঁকির দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর। আইআরজিসির হামলা, হামলার চেষ্টা এবং হয়রানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, প্রথম আলো