কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
যে শ্রেণিকক্ষে বসে ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেখানে এখন হাঁটুপানি। যে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা শিশু-কিশোরদের, বছরের প্রায় ছয় মাস সেটি ডুবে থাকে পানিতে। বই-খাতা, স্কুল ড্রেস ভিজে যায়। নোংরা পানির মধ্যে বসেই কখনো কখনো পাঠ নিতে হয় শিক্ষার্থীদের।
বর্ষা এলেই যেন শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে ফেলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়ের নিচতলার শ্রেণিকক্ষগুলোতে এখন প্রায় হাঁটুপানি। অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পানিতে একদিকে যেমন পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি।
দূরের অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের নিয়মিত পড়াশোনা।
১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি দৌলতপুরের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
প্রতিবছর বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করলেও দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন সমস্যার কারণে বর্ষা মৌসুমে সেই শিক্ষা কার্যক্রমই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই, দুর্ভোগ বছরের পর বছর
স্থানীয়দের অভিযোগ, আল্লারদর্গা বাজার এলাকায় কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার পানি বিদ্যালয়ের মাঠে জমে যায়। বছরের অধিকাংশ সময়ই মাঠটি ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে।
বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের চারপাশ পানিবন্দী হয়ে পড়ার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষগুলোতেও পানি প্রবেশ করে। ফলে শুধু পাঠদানই নয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান ও পাঠগ্রহণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
অনেক সময় বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত কষ্টকর ও অনুপযোগী।

‘সারাদিন ভেজা অবস্থায় থাকতে হয়’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাছকিয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আমাদের শ্রেণিকক্ষ, কমনরুম ও শিক্ষকদের অফিসে পানি জমে যায়। বই-খাতা ও স্কুল ড্রেস ভিজে যায়।
সারাদিন ভেজা অবস্থায় থাকতে হয়। এতে ঠান্ডা, সর্দি ও জ্বরসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে হয়। অনেক দূরের শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে চায় না। আমরা এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।’
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রিহান বলেন, ‘আমাদের ক্লাসরুমে পানি ঢুকে জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রতিবছরই এমন হয়। আমার কয়েকজন বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অনেকে স্কুলেও আসে না। এতে আমাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।’
ছয় মাস মাঠ অচল, বন্ধ খেলাধুলা
বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। বছরের প্রায় ছয় মাস মাঠে পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ নীরব বলেন, ‘বছরের প্রায় ছয় মাস মাঠে পানি জমে থাকে। অনেক সময় মাঠে হাঁটু পানি হয়ে যায়। পানি নেমে গেলেও কাদা, শামুক ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের কারণে খেলাধুলা করা যায় না।
খেলতে গিয়ে হাত-পা কেটে যায়। আমাদের খেলাধুলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’
শিক্ষাবিদদের কাছে শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বিদ্যালয়ের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্ষা এলেই উদ্বেগ নিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অনেকে বিদ্যালয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। তারা দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
‘শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষ পানিতে তলিয়ে যায়।
বছরের প্রায় ছয় মাস মাঠ ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, মেধা বিকাশ ও নিয়মিত পাঠগ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে চায় না এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বিদ্যালয় থেকে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ পানি নিষ্কাশনের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করে এই দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক।’
পরিদর্শন করেছেন সংসদ সদস্য
স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।
যত দ্রুত সম্ভব এখানে কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে পাঠদান ও পাঠগ্রহণের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’
প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিবছর বর্ষা এলেই যদি একই চিত্র ফিরে আসে, তাহলে এত বছরেও কেন স্থায়ী পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে উঠল না?
একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ যদি বর্ষার পানিতে ডুবে থাকে, তবে সেখানে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় কার?