শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
যশোরের বাজারে পোলাও চালের দাম এখন ক্রমেই বাড়ছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির হার প্রায় ৩৯ শতাংশ।
খুচরা বাজারে খোলা পোলাও চাল বা চিনিগুঁড়া চাল আগে প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হতো। এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি। কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা।
সোমবার সকালে যশোর শহরের বড়বাজার, পালবাড়ি, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, রেল স্টেশন বাজার, চাঁচড়া বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারের মুদি দোকান বা চাউলের দোকানে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোলাও চালেও একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বাবুর্চি সুপার রাইসের চিনিগুঁড়া চাল আগে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে দাম ৯০ টাকা। প্রাণের চিনিগুঁড়া চালের দাম আগে ছিল ১৯০ টাকা কেজি। এখন বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা। চাষী ব্র্যান্ডের পোলাও চালের দাম আগে প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা।
শহরের পালবাড়ি বাজারে পোলাও চাল কিনতে আসা সোহরাব হোসেন নামে একজন ক্রেতা বলেন, আগে অনুষ্ঠানের জন্য পাঁচ থেকে ১০ কেজি চাল কিনলেও এখন পরিমাণে কম কিনতে হচ্ছে।
পুলিশ লাইন এলাকার লিটন শেখ বলেন, আগে যে টাকায় দশ কেজি পোলাও চাল কেনা যেতো, এখন সেই টাকায় অনেক কম মিলছে। দাম যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে অনুষ্ঠানেও সাধারণ চাল ব্যবহার করতে হবে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা নিজেরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন না। দেশের উৎপাদিত সুগন্ধি চালের একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমেছে।
সদরের ডাকাতিয়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে ৭৫ কেজির এক বস্তা চিনিগুঁড়া ধান চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার দুইশ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে এ ধান চাষ করেছিলেন। ধানের দাম যখন পাঁচ হাজার দুইশ টাকায় ওঠে তখনই কৃষকের ঘরের ধান শেষ হয়ে যায়। ফলে কৃষকরা বাড়তি দামের সুফল পাননি।
সদরের বেলেরমাঠ গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন জানান, গত বছর তিনি ৩৬ বিঘা জমিতে চিনিগুঁড়া ধানের চাষ করেন। এবার দাম বেশি দেখে ৩৮ বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন। তিনিও মনে করেন, রপ্তানির কারণেই দাম বেড়েছে।
সদরের চুড়ামনকাটি বাজারে চালের আড়তদার নওয়াব আলী বলেন, ধান ওঠার সময় ৭৫ কেজির এক বস্তা চার হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়েছিল। পরে তা ছয় হাজার টাকায় ওঠে। এখন সেই ধানের দাম সাড়ে আট হাজার টাকা। এলাকায় ধানের ঘাটতির কারণেই দাম বেশি।
শহরের বড়বজারের মা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী দীপংকর বিশ্বাস বলেন, রপ্তানি চাহিদা না থাকলে বাজারে সরবরাহ আরও বেশি থাকতো। বর্তমানে কোম্পানি ও বড় ব্যবসায়ীরা বেশি দামে চাল কিনছে। ফলে ছোট ব্যবসায়ীদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পরিবহন, দোকান পরিচালনার খরচসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ করে খুচরা পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
পালবাড়ি বাজারের ইসরাইল চাউলের আড়তের স্বত্বাধিকারী মো. ইসরাইল মন্ডল বলেন, দেশের পোলাও চাল এখন বিদেশের বাজারেও যাচ্ছে। ফলে মিল পর্যায় থেকে সরবরাহের ওপর চাপ পড়ছে। আগে যে দামে চাল পাওয়া যেতো, এখন সেই দামে কেনা যাচ্ছে না। পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ে।
পোলাও চালের দাম বাড়ায় রেস্তোরাঁ ও খাবারের ব্যবসাতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পোলাও বা বিরিয়ানি রান্নায় ৫০ কেজি চাল ব্যবহার করা হলে কেজিতে ৫০ টাকা বাড়তি দরে শুধু চালেই অতিরিক্ত খরচ হয় আড়াই হাজার টাকা।
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, কোনো পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের হিসাব-যাচাই প্রয়োজন। কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করলে বা ক্রয়মূল্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে অতিরিক্ত মুনাফা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চালের বাজারেও প্রয়োজন হলে ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ ও মূল্যতালিকা যাচাই করা হবে।